আইন আদালতলিড নিউজসিলেট

আপন চাচাতো ভাইকে অপহরনের কারন জানালেন দুই অপহরণকারী!

বিশ্বনাথ প্রতিনিধি  :: অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার টাকা যোগাড় করতে ও পরিবারে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে অভাবের তাড়নাই আপন চাচাতো ভাইয়ের ছেলে স্কুল ছাত্র হুসাইন আহমদ (৫)’কে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে দুই স্কুল ছাত্রী আলিমা বেগম (১৬) ও রাইমা আক্তার পূর্নিমা (১৩)। গ্রেপ্তারের পর থানা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে দুই বোন এমন তথ্য দিয়েছে বলে স্থানীয় সাংবাদিকদেরকে জানিয়েছেন থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা পিপিএম।

এদিকে আলিমা ও রাইমার এমন করুণ কাহিনী শুনে ও তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক দূরস্থা দূর করতে দুই স্কুল ছাত্রীকে আর্থিকভাবে সহযোগীতার পাশাপাশি দুটি সেলাই মেশিন প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন উপজেলার দৌলতপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সধারণ সম্পাদক আমির আলী এবং যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা ও শাহজিরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা প্রবাসী আবদুন নূর।

গ্রেপ্তারকৃতদের বরাত দিয়ে ওসি দোহা জানান, অপহৃত স্কুল ছাত্র হুসাইন আহমদের পিতা উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের সিংড়াওলী গ্রামের বকুল মিয়ার আপন চাচাতো বোন আলিমা বেগম ও রাহিমা আক্তার পূর্নিমা। ৪ মেয়ে ও ১ ছেলের জন্মের পর তাদের (আলিমা ও রাইমা) পিতা আলা উদ্দিন তাদের মা হেনোয়া বেগম’কে ছেড়ে দিয়ে আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র (দিরাই উপজেলায় নিজ বাড়িতে) বসবাস করছেন। আর সিংড়াওলী গ্রামে মা ও ভাই-বোনদের নিয়ে বসবাস করছেন আলিমা ও রাইমা। তাদের পরিবারের দেখাশুনা করেন চাচাতো ভাই বকুল মিয়া। সিংরাওলী গ্রামে একই বাড়িতে জায়গা ক্রয় করে বকুল মিয়া ও তার চাচী হেনোয়া বেগম (আলিমা ও ও রাইমার মা)’ক পৃথক ঘর তৈরী করে দেন বকুল মিয়া ও দুই স্কুল ছাত্রীর (আলিমা ও রাইমা) ফুফু (যুক্তরাজ্য প্রবাসী)। আলিমা ও রাহিমার মা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের (দিনমজুর) কাজ করে সন্তানদের পড়ালেখা সহ সংসারের যাবতীয় খরছ চালান। পাশাপাশি লন্ডন থেকে তাদের ফুফু মাঝে মধ্যে বকুল মিয়ার মাধ্যমে তাদেরকে আর্থিকভাবে সহযোগীতা করেন। কিন্ত ফুফুর পাঠানো টাকা থেকে একটি অংশ তাদেরকে দিয়ে বাকি সব টাকা নিজে ভোগ করেন বকুল মিয়া। এতে বকুল মিয়ার প্রতি মনে ক্ষোভ জন্ম নেয় আলিমা ও রাহিমার। কিন্ত প্রকাশ্যে বকুল মিয়াকে তারা কিছু বলতে না পারায় একপর্যায়ে আলিমা ও রাইমা সিদ্ধান্ত নেয় বকুল মিয়ার ছেলে হুসাইন আহমদকে অপহরণ করার। তাদের পরিকল্পনা ছিলো তারা হুসাইন আহমদকে অপহরণ করে তার পিতার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করবে। এরপর ওই টাকা থেকে কিছু টাকা নিজের কাছে রেখে বাকি টাকা বকুল মিয়াকে ফেরৎ দিয়ে দিবে এবং যে টাকাটা তাদের কাছে থাকবে ওই টাকা দিয়ে তারা তাদের মায়ের চিকিৎসার জন্য ব্যয় করবে ও মাকে নিয়ে ঢাকায় চলে যাবে। সেখানে গিয়ে যে কোন গার্মেন্টসে চাকুরী করে সংসার চালাবে। তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী হুসাইন আহমদকে অপহরণ করে। এঘটনায় সোমবার রাতে আলিমা ও রাইমার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (ঘং-০৩) এর ৭/৮ ধারায় একটি মামলা (মামলা নং- ০৮) দায়ের করেছেন। মঙ্গলবার (১০ এপ্রিল) গ্রেফতারকৃত আলিমা ও রাইমাকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।

মামলা দায়ের ও গ্রেফতারকৃতদের আদালতে প্রেরণের বিষয়টি নিশ্চিত করে থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) শামসুদ্দোহা পিপিএম বলেন, প্রথমিক তদন্তে বুঝা যাচ্ছে গ্রেফতারকৃতরা প্রফেসনাল অপহরণকারী নয়। যদি তা হতো তাহলে অপহৃত শিশুটিকে নিয়ে তারা থানার পার্শ্ববর্তী মার্কেটে অবস্থান করতো না এবং এতো দ্রুত ভিকটিমকে উদ্ধার করা সম্ভব হতো না। তিনি বলেন, আলিমা ও রাইমার পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা দূর করতে তাদেও পরিবারকে আর্থিকভাবে সহযোগীতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এক প্রবাসী। সামাজিক অবক্ষয় ও বিদেশী চ্যানেলগুলোর কারণে আমাদের সমাজে এধরণের অপরাধমূলক কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

দৌলতপুর ইউপি চেয়ারম্যান আমির আলী বলেন, মূলত পরিবারে আর্থিক অভাব অনটনের কারণেই ওই মেয়েরা এঘটনাটি ঘটিয়েছে। তাদের পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা লাগবে আলিমা ও রাইমাকে দুটি সেলাই মেশিন তিনি প্রদান করবেন বলে জানান।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার উপজেলার সিংগেরকাছ বাজারস্থ ইকরা মডেল একাডেমী থেকে প্লে শ্রেণীর ছাত্র হুসাইন আহমদকে অপহরণ করা হয়। অপহরণের পর মোবাইল ফোনে তার পিতার কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ঘটনার ৩ঘন্টার ভিতরে অপহরণকারীদের দেয়া বিকাশ নাম্বারটি ট্র্যাকিং এর মাধ্যমে অবস্থান চিহিৃত করে পুলিশ। তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা সদরের আল-হেরা মার্কেট থেকে হাতে নাতে অপহৃত হুসাইনের ফুফু (বাবার চাচাতো বোন) ২স্কুল ছাত্রীকে আটক করে পুলিশ। এসময় তাদের সাথে থাকা হুসাইনকে উদ্ধার এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই বিকাশ দোকানের মালিক ও তার ভাইকে থানায় নিয়ে আসা হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সোমবার রাতে অপহৃত শিশুর পিতা বাদি হয়ে থানায় মামলা দায়ের করলে মঙ্গলবার দুপুরে আটককৃত দুই বোনকে আদালতে প্রেরণ করে পুলিশ।

Related Articles

Back to top button