শিল্প ও সাহিত্য
আসিফা বানু: সাম্প্রদায়িকতার আরেক শিকার


এইচ বি রিতা: ১৯৮৬ সালে ডেভিড ক্রনেনবার্গ একটি সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র নির্মান করেন, নাম ‘দ্য ফ্লাই।’ দ্য ফ্লাই এর একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল ড.সেথ ব্রান্ডল। ছবিটিতে তিনি গোপন এক গবেষণায় লিপ্ত হন যার বিষয়বস্তু ছিল- কোন এক বস্তু বা প্রাণীকে অন্য বস্তু বা প্রাণীতে রূপান্তর করা। গবেষণার একপর্যায়ে অদ্ভুত এই বিজ্ঞানী বড় রকমের একটি ভুল করে বসেন এবং তার সেই ভুলের ফলে তিনি নিজে মানুষ থেকে সরীসৃপে রূপান্তরিত হতে শুরু করেন।
চোখের সামনে নিজেকে বদলাতে দেখে ড. ব্রান্ডল হিশ হিশ করে মন্তব্য করেন, ‘বি অ্যাফ্রেইড, বি ভেরি অ্যাফ্রেইড।’ অর্থাৎ ভীত হও, ভীষণ রকম ভীত হও। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো সরীসৃপে পরিণত হননি তবে তার গলায় ও হিশ-হিশ আওয়াজ বের হতে দেরী নেই। নরেন্দ্র মোদি সরকারের সমর্থনে সারা ভারতে হিন্দু মৌলবাদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধির সাথে, সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা যে বেড়েছে, অর্থাৎ ভারতের হিন্দুদের মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষ যে ভয়ানক আকার ধারণ করেছে, তা আজ স্পষ্ট ৷
দিল্লির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক তথ্য প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গত বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে ৮২২টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ১১১ জন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ৩৮৪ জন। ২০১৬ সালে সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটে ৭০৩টি। আর প্রাণহানি হয়েছিল ৮৬ জনের। ভারতজুড়ে দীর্ঘদিন যে কুৎসিত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির খেলা চলছে,কাশ্মিরের কাঠুয়া শহরে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি অমানবিক বর্বরতা তারই জ্বলন্ত প্রমান। ১০ই জানুয়ারি ভারত শাসিত কাশ্মিরের কাঠুয়া শহরের কাছে মুসলিম যাযাবর সম্প্রদায়ের আট বছরের একটি শিশু নিখোঁজ হয়।
১৭ই জানুয়ারি তার দুমড়ানো মুচড়ানো পঁচাগলা লাশ উদ্ধার করা হয়। ৮ বছর বয়সী শিশুটিকে প্রথমে অপহরণ করে স্থানীয় একটি জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে এনে একটি মন্দিরে রেখে এক সপ্তাহ ধরে গণধর্ষণ করা হয়। সবেশেষে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। শুধু তাই নয়, ধর্ষণ ও হত্যা শেষে পাথর দিয়ে থেতলে দেয়া হয় তার মাথা। যতদিন বন্দি ছিল শিশুটি, ততদিন তাকে না খাইয়ে মাদকাশক্ত করে রেখে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়। শুধু তাই নয়, টানা ধর্ষণের পর ধর্ষণকারীরা যখন সিদ্ধান্ত নেয় শিশুটিকে মেরে ফেলার, তখন একজন অভিযুক্ত ধর্ষক বলে, “এখনই মেরো না। দাঁড়াও। আমি ওকে শেষবারের মতো একবার ধর্ষণ করে নিই।” শিশুটি মরে গিয়েও পার পায়নি এই বর্বরতা হতে। তার দাফন নিয়েও শুরু হয় সহিংসতা।
শিশুটির পিতা চেয়েছিল শিশুটিকে একটি কবরস্থানে দাফন করতে। কিন্তু শিশুটিকে দাফন করতে এলে তাদেরকে চারপাশে ঘিরে ফেলে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা। তারা শিশুটির পিতাকে হুমকি দেন যদি তার কন্যাকে সেখানে দাফন করা হয় তবে সহিংসতা হবে।বাধ্য হয়ে অসহায় পিতা অভাগিনী কন্যাকে সমাহিত করতে সাত মেইল হেটে অন্য এক গ্রামে যান। শিশুটির নাম আসিফা বানু। আসিফা বানু একজন কাশ্মীরি বালিকা। পিতা মুহাম্মদ ইউসুফ পুজওয়ালা। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের গুজার গোত্রের বাসিন্দা ইউসুফ। এই মুসলিম সম্প্রদায় মূলত যাযাবর। এরা গ্রীষ্মকালে পাহাড়ের উঁচু চারণভূমিতে এবং শীতকালে হিন্দু অধ্যুষিত জম্মু এলাকার সমতলভূমিতে ভেড়া চরায়। শিশু ধর্ষণ ও হত্যা প্রতিদিন হচ্ছে। আসিফা ধর্ষণ ও হত্যা নতুন কিছু নয়।
এসব এখন আমাদের গা সওয়া ব্যাপার। তবে কেন আসিফা ধর্ষণ ও হত্যা নিয়ে এত মাতামাতি? কারণ- আসিফা আর দশটা ঘটনার মত নিছক বিকৃত যৌন লালসার শিকার নয়। আসিফা ভারতের হিন্দু মৌলবাদের সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসার শিকার। আসিফার প্রতি এই বর্বরতার পিছনে রয়েছে বৃহৎ পরিকল্পনা। হোক হিন্দু বা মুসলিম, সংখ্যালঘুরা সর্বত্রই নির্যাতীত। ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের কাঠুয়া এলাকা মূলত হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। এখানে গুজার সম্প্রদায়ের মুসলিম যাযাবরের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাছাড়া যাযাবর সম্প্রদায় পশুপালনের কাজে জম্মুর সরকারী ও বনের জমি ব্যবহার করেন।
এ নিয়ে প্রায়ই ওই অঞ্চলের হিন্দু বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের বিরোধ হয়। শুধু মাত্র বিরোধের কারণে আসিফাকে নির্ধমমভাবে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে এমনটি ভাবা অমূলক। কাশ্মীর হতে মুসলিম গুজার সম্প্রদায়কে ভয় দেখিয়ে জম্মু ছাড়তে বাধ্য করতেই এই অপরাধ সংঘটন করা হয়েছে। এই ধর্ষণ যারা করেছে এবং ধর্ষণের পিছনে যাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে, তারা ডানপন্থী বিজেপির সক্রীয় সদস্য। আসিফার মৃত্যুর ঘটনায় ভারতীয় পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের সিনিয়র কর্মকর্তা রমেশ কুমার জাল্লার দুঃসাহসিক চেষ্টায় একে একে গ্রেফতার হয় আট অপরাধী। তার মধ্যে রয়েছে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা, চার জন পুলিশ কর্মকর্তা ও এক কিশোর। সঞ্জি রাম নামে ৬০ বছর বয়সী ওই অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা আসিফাকে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার পরিকল্পনা করেন। তাকে সহায়তা করেন সুরেন্দ্র ভার্মা, আনন্দ দত্ত, তিলক রাজ ও খাজুরিয়া নামে চার পুলিশ কর্মকর্তা।
অভিযুক্তদের গ্রেফতারের পরই শুরু হয় হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের বিক্ষোভ সমাবেশ। ‘হিন্দু একতা মোর্চা’ নামে নতুন একটি গোষ্ঠী এ ঘটনায় অভিযুক্তদের রক্ষা করার দাবিতে একটি বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। এই গোষ্ঠীর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজক বিজয় শর্মা জম্মু ও কাশ্মীরে বিজেপির একজন উচ্চপর্যায়ের নেতা। ওই বিক্ষোভ সমাবেশে রাজ্য সরকারের দুই বিজেপি মন্ত্রী চন্দ্র প্রকাশ গঙ্গা ও চৌধুরী লাল সিং অভিযু্ক্তদের রক্ষার দাবিতে হিন্দু একতা মোর্চা মঞ্চের মিছিলে যোগ দেন। আসিফাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয় জানুয়ারী মাসে। ফেব্রুয়ারী-মার্চ জুড়ে এই নির্মমতার খবর কাশ্মির থেকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু এ দীর্ঘ সময় ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো বর্বর এই ঘটনাটি প্রকাশ করেনি। যখন এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার প্রথম পাতায় এ ঘটনার লোমহর্ষক বিবরণ ছাপা হয়, তখন থেকে আসিফা হত্যার বিচারের দাবিতে দল-ধর্ম নির্বিশেষে বিক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নামতে শুরু করেন এবং বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও যখন এই খবরটি ফলাও করে ছাপা হতে শুরু করে, তখন ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোও আসিফা হত্যা নিয়ে সোচ্চার হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল-ঘটনার তিন মাস পর হঠাৎ কেন নড়েচড়ে বসল ভারতের সংবাদমাধ্যম? তবে কি হিন্দু ডানপন্থী দলগুলো তাদের সম্প্রদায়ের ব্যক্তিকে গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানানোর কারণেই ভারত সংবাদমাধ্যমগুলো সোচ্চার হয়ে উঠেছে? নাকি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবরটি গুরুত্ব পাওয়ায় ভারতীয় সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে ভারত সংবাদমাধ্যমগুলো এখন জেগে উঠেছে? ২০১২ সালে দিল্লিতে যখন ২৩ বছর বয়সী মেডিকেল ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তখন তাৎক্ষণিকভাবে দিল্লির রাজপথে যেমন প্রতিবাদের ঢল নামে, পুরো রাজ্য যেভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছিলো,
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল, আসিফার ক্ষেত্রে দেখা যায় তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কিন্তু কেন? তবে কি ধরে নিব যে আসিফার ক্ষেত্রে ধর্মীয় সম্মান রক্ষার বিষয়টিও জড়িত ছিলো? হতে পারে এ কারণেই ভারতীয় মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো অপরাধের এই খবরটি উপেক্ষা করতে চেয়ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে দীর্ঘ তিন মাস পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নীরবতা ভেঙ্গে টুইট করে ঘোষণা দিলেন, ‘কোনো অপরাধী ছাড় পাবে না। আমাদের মেয়েরা অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবে।’
৮ বছরের যে শিশুটির এখনো ঋতুস্রাবই হয়নি, সে শিশুটিকে এমন নির্মমভাবে ধর্ষণ করে হত্যা করা, কখনোই কোন সভ্য সমাজ বা দেশে ঘটতে পারে না। এই ভয়াবহ ঘটনা ভারতের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক বিভেদকে আরো জোরদার করেছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে গত চার বছরে ভারতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গোঁড়ামী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের মন্ত্রী, কর্মকর্তা, ডানপন্থী গণমাধ্যম ও সমর্থকরা যা খুশী তাই করছে। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো থাকছে নীরব যতক্ষন না এ নিয়ে জনগণ সোচ্চার হয়। যে দেশের নাগরিকদের প্রায় ১৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৭ কোটি মানুষ মুসলমান, সেখানে এমন সাম্প্রদায়িকতা নিঃসন্দেহে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ভারত রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র আসলে অসাম্প্রসায়িক না সাম্প্রদায়িক, আসিফা হত্যা ও হত্যাকারীদের পক্ষে বিজেপির সমর্থন, ভারতীয় মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর দায়িত্বহীনতার লড়াই- প্রতিফলিত হয়েছে আসিফা হত্যার ঘটনায়। এখানে উল্লেখ্য করা প্রয়োজন যে, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০২ সালে,অযোধ্যা থেকে সবরমতি এক্সপ্রেসে কর সেবকদের ফিরতি পথে ট্রেন গোধরা রেলস্টেশনে পৌঁছলে, ট্রেনে আগুন লেগে প্রায় ৬০ জন হিন্দুর মৃত্যু হয়। কী কারণে এই অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল, কারা এর জন্য দায়ী ছিল এ বিষয়ে কিছু প্রমাণিত না হলেও, এই হত্যাকাণ্ড মুসলমানদের কাজ- এই প্রচার চালিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার দল বিজেপি গুজরাটে ভারতের ইতিহাসে জঘন্যতম যে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড ঘটান, তাতে প্রায় দুই হাজারের বেশি মুসলমানের প্রাণ যায়।
আরো উল্লেখ্য যে, ভারতে হিন্দু মৌলবাদীদের অসহনশীলতা এবং বিদ্বেষমূলক অপরাধ আটকাতে সরকার ব্যর্থ হওয়ার প্রতিবাদে,এ পর্যন্ত ২৩ জন বিশিষ্ট সাহিত্যিক তাঁদের সাহিত্য পুরস্কার ফেরত দিয়েছেন। স্বার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী একটি রাষ্ট্রে যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান নিজেই সাম্প্রদায়িকতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ, সেখানে আসিফার মত মুসলিম সংখ্যালঘুদের ধর্ষণের পর হত্যা করার মত ঘটনা খুবই তুচ্ছ ঘটনা মাত্র। আসিফা, একটি অবুঝ শিশু। জীবনকে বুঝার আগেই তাকে চলে যেতে হয়েছে নিষ্ঠুর এই পৃথিবী থেকে।
যাওয়ার আগে সে জানলো না তার অপরাধ কি ছিল! বিশ্ববাসী জানলনা কি অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে আসিফা চলে গেল! কেউ কোনদিন জানবেওনা কি মরণ ব্যথা বুকে নিয়ে আসিফার পিতা-মাতা রোজ নিঃশ্বাস নিবেন! পৃথিবী প্রতিদিন একটু একটু করে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। শুধু এক আসিফা নয়, রোজ চোখ খুলার আগেই বিদায় নিচ্ছে এমন বহু আসিফা একবুক অভিমান বুকে নিয়ে। আমরা তাদের যেতে দেই। আমরা কিছু করতে পারিনা। আমাদের বিবেক ঘুমন্ত, ঠিক যেন ওয়াশিংটন আর্ভিংয়ের রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মত।




