অভিযুক্তদের গ্রেফতারের পরই শুরু হয় হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের বিক্ষোভ সমাবেশ। ‘হিন্দু একতা মোর্চা’ নামে নতুন একটি গোষ্ঠী এ ঘটনায় অভিযুক্তদের রক্ষা করার দাবিতে একটি বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। এই গোষ্ঠীর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজক বিজয় শর্মা জম্মু ও কাশ্মীরে বিজেপির একজন উচ্চপর্যায়ের নেতা। ওই বিক্ষোভ সমাবেশে রাজ্য সরকারের দুই বিজেপি মন্ত্রী চন্দ্র প্রকাশ গঙ্গা ও চৌধুরী লাল সিং অভিযু্ক্তদের রক্ষার দাবিতে হিন্দু একতা মোর্চা মঞ্চের মিছিলে যোগ দেন। আসিফাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয় জানুয়ারী মাসে। ফেব্রুয়ারী-মার্চ জুড়ে এই নির্মমতার খবর কাশ্মির থেকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু এ দীর্ঘ সময় ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো বর্বর এই ঘটনাটি প্রকাশ করেনি। যখন এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার প্রথম পাতায় এ ঘটনার লোমহর্ষক বিবরণ ছাপা হয়, তখন থেকে আসিফা হত্যার বিচারের দাবিতে দল-ধর্ম নির্বিশেষে বিক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নামতে শুরু করেন এবং বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও যখন এই খবরটি ফলাও করে ছাপা হতে শুরু করে, তখন ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোও আসিফা হত্যা নিয়ে সোচ্চার হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল-ঘটনার তিন মাস পর হঠাৎ কেন নড়েচড়ে বসল ভারতের সংবাদমাধ্যম? তবে কি হিন্দু ডানপন্থী দলগুলো তাদের সম্প্রদায়ের ব্যক্তিকে গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানানোর কারণেই ভারত সংবাদমাধ্যমগুলো সোচ্চার হয়ে উঠেছে? নাকি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবরটি গুরুত্ব পাওয়ায় ভারতীয় সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে ভারত সংবাদমাধ্যমগুলো এখন জেগে উঠেছে? ২০১২ সালে দিল্লিতে যখন ২৩ বছর বয়সী মেডিকেল ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তখন তাৎক্ষণিকভাবে দিল্লির রাজপথে যেমন প্রতিবাদের ঢল নামে, পুরো রাজ্য যেভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছিলো,
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল, আসিফার ক্ষেত্রে দেখা যায় তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কিন্তু কেন? তবে কি ধরে নিব যে আসিফার ক্ষেত্রে ধর্মীয় সম্মান রক্ষার বিষয়টিও জড়িত ছিলো? হতে পারে এ কারণেই ভারতীয় মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো অপরাধের এই খবরটি উপেক্ষা করতে চেয়ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে দীর্ঘ তিন মাস পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নীরবতা ভেঙ্গে টুইট করে ঘোষণা দিলেন, ‘কোনো অপরাধী ছাড় পাবে না। আমাদের মেয়েরা অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবে।’
৮ বছরের যে শিশুটির এখনো ঋতুস্রাবই হয়নি, সে শিশুটিকে এমন নির্মমভাবে ধর্ষণ করে হত্যা করা, কখনোই কোন সভ্য সমাজ বা দেশে ঘটতে পারে না। এই ভয়াবহ ঘটনা ভারতের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক বিভেদকে আরো জোরদার করেছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে গত চার বছরে ভারতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গোঁড়ামী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের মন্ত্রী, কর্মকর্তা, ডানপন্থী গণমাধ্যম ও সমর্থকরা যা খুশী তাই করছে। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো থাকছে নীরব যতক্ষন না এ নিয়ে জনগণ সোচ্চার হয়। যে দেশের নাগরিকদের প্রায় ১৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৭ কোটি মানুষ মুসলমান, সেখানে এমন সাম্প্রদায়িকতা নিঃসন্দেহে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ভারত রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র আসলে অসাম্প্রসায়িক না সাম্প্রদায়িক, আসিফা হত্যা ও হত্যাকারীদের পক্ষে বিজেপির সমর্থন, ভারতীয় মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর দায়িত্বহীনতার লড়াই- প্রতিফলিত হয়েছে আসিফা হত্যার ঘটনায়। এখানে উল্লেখ্য করা প্রয়োজন যে, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০২ সালে,অযোধ্যা থেকে সবরমতি এক্সপ্রেসে কর সেবকদের ফিরতি পথে ট্রেন গোধরা রেলস্টেশনে পৌঁছলে, ট্রেনে আগুন লেগে প্রায় ৬০ জন হিন্দুর মৃত্যু হয়। কী কারণে এই অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল, কারা এর জন্য দায়ী ছিল এ বিষয়ে কিছু প্রমাণিত না হলেও, এই হত্যাকাণ্ড মুসলমানদের কাজ- এই প্রচার চালিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার দল বিজেপি গুজরাটে ভারতের ইতিহাসে জঘন্যতম যে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড ঘটান, তাতে প্রায় দুই হাজারের বেশি মুসলমানের প্রাণ যায়।
আরো উল্লেখ্য যে, ভারতে হিন্দু মৌলবাদীদের অসহনশীলতা এবং বিদ্বেষমূলক অপরাধ আটকাতে সরকার ব্যর্থ হওয়ার প্রতিবাদে,এ পর্যন্ত ২৩ জন বিশিষ্ট সাহিত্যিক তাঁদের সাহিত্য পুরস্কার ফেরত দিয়েছেন। স্বার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী একটি রাষ্ট্রে যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান নিজেই সাম্প্রদায়িকতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ, সেখানে আসিফার মত মুসলিম সংখ্যালঘুদের ধর্ষণের পর হত্যা করার মত ঘটনা খুবই তুচ্ছ ঘটনা মাত্র। আসিফা, একটি অবুঝ শিশু। জীবনকে বুঝার আগেই তাকে চলে যেতে হয়েছে নিষ্ঠুর এই পৃথিবী থেকে।
যাওয়ার আগে সে জানলো না তার অপরাধ কি ছিল! বিশ্ববাসী জানলনা কি অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে আসিফা চলে গেল! কেউ কোনদিন জানবেওনা কি মরণ ব্যথা বুকে নিয়ে আসিফার পিতা-মাতা রোজ নিঃশ্বাস নিবেন! পৃথিবী প্রতিদিন একটু একটু করে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। শুধু এক আসিফা নয়, রোজ চোখ খুলার আগেই বিদায় নিচ্ছে এমন বহু আসিফা একবুক অভিমান বুকে নিয়ে। আমরা তাদের যেতে দেই। আমরা কিছু করতে পারিনা। আমাদের বিবেক ঘুমন্ত, ঠিক যেন ওয়াশিংটন আর্ভিংয়ের রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মত।