শিল্প ও সাহিত্য

জিনাত আরা জিতুর একগুচ্ছ কবিতা

🌹অভিসার

এই যে ধুলোমাখা পথে রোজ হাঁটছি,
হুড ফেলা রিক্সায় রোদচশমার আড়ালে এই যে রোদের সাথে আমার দ্বিপাক্ষিক সমর ;
এসব নিছক অভ্যেসের কারন।
কিন্তু তুমি আমার অভ্যেস নও নিরুপন!
তুমি আমার অভিলাষ,
তুমি আমার নীলকন্ঠ পাখি;
যার রক্তাক্ত ঠোঁকরেও আমার উন্মত্ত পূর্নতা রাখা থাকে।
এই যে রোজ খাচ্ছি,ঘুমাচ্ছি হৈ হুল্লোর হুজ্জতিতে দিনানিপাত আমার,
এসবই আমার জৈবিক প্রয়োজন!
কিন্তু তুমি আমার আবছা আলোয় দেখে নেয়া বড্ড প্রিয় একখানা মুখ,
যার আঁড়চোখে তাকানো এক ঝলক দৃষ্টিতে ঝলসে ওঠে আমার ভেতর-বাহির ;
তুমি আমার রোজকার অভ্যেস নও নিরুপন!
তুমি আমার গোপন কুঠুরিতে টিপ টিপ করে জমতে থাকা গোপন সুখ,
তুমি আমার অবাধ্য আচরনে ঝাপ দিয়ে লুটে নেয়া এক চিলতে আফসোস।
রোজ অফিস ফিরতি জ্যামে,ঘামে উৎকট গা গুলোনো গন্ধকে উপেক্ষা করে এইযে জীবিকা ধারণে সুপরিপাটি আমি!
এখানে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই নিরুপন;
বরং সন্ধ্যায় গা ধুয়ে পাটভাঙ্গা শাড়িতে জরানো আমার এবং আয়নার মধ্যস্ততায় এক বিন্দু কাজল দিয়ে যখন আমাকে আঁকি!
তারপর হুটহাট যখন নজরবন্ধি হয় তোমাকে দেখতে না দেবার দক্ষ অভিনয় আমার;
রোজকার ঝুট-ঝামেলা,বাসের ঘামমাখা দুর্দান্ত রেসের
পরিক্রমা ও এইসব মিথ্যে অভিনয়কে আমি আজকাল আমার পূর্নতা ভাবি।

🌹 দূরত্ব

প্রিয়মুখ,
জানি বড্ড অযন্ত অবহেলায় কাটে আমিহীন তোমার নিশ্চুপ প্রহরগুলো ,
জানি আমি আসলেই তোমার রোপিত কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে লেগে যায় ফাগুনের আগুন ;
কি করবো বলো !
আমিও কি অসীম শূন্যতায় ডুবে থাকিনা তোমার অভাবে ?
আমার দুয়ারের সাদামাটা আল্পনাগুলোও কি অপেক্ষা করেনা তোমার রঙ্গীন স্পর্শের !
কি লাভ বলো আমাদের শূন্যতাগুলোতে পূর্নতা খোঁজার ;
তার থেকে বরং এসো,যতক্ষন আমরা পাশাপাশি থাকি তারও থেকে কাছে না থাকা সময়গুলোতে আমরা অনুভবে থাকি একে অপরের !
ভেবে নেই পাশেই আছি,নিঃশ্বাসে ছোঁয়া রয়ে গেছে দু’জনের।

🌹বিধি-নিষেদ

মহামান্য কবি,
বিনীত নিবেদন, আপনি বরং ক’গুচ্ছ প্রেমের কবিতা লিখুন!
আমরা হুটোপুটি খেলি আপনার কাব্যরসের রঙ্গীন হোলিতে;
ঢেকে দেই আবিরের নিচে বীভৎস ক্ষত-বিক্ষত সভ্যতাকে।
প্রিয় কবি,
আপনার ভুলে যেতে হবে আপনার কলমে আছে তরবারির তীক্ষ্ণ তেজ!
শ্বেত শুভ্র কাগজে ঘষঘষে শব্দে দু’চার লাইন লিখেই আপনি জ্বেলে দিতে পাড়েন ধাঁ ধাঁ আগুন তরুণ সমাজের বক্ষকরোটিতে;
আপনি ভুলে যান আপনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন অনাগত শিশুর কাছে,
অঙ্গীকার করেছিলেন এ পৃথিবীকে তার বসবাসযোগ্য করে দিয়ে যাবেন আপনি।
কবিবর,
আপনার বিদ্রোহ করা সাজেনা ;
আপনি বরং শুধু ভালোবাসার কথা লিখুন!
ফুল,পাখি,বসন্ত অথবা নদীর স্রোতের মত প্রবাহমান গতিশীলতার কথা বলুন ;
আপনার কবিতার পান্ডুলিপিতে জমা হোক থরে থরে সাজানো ইট,বালু,সিমেন্ট সম্বলিত অট্টালিকায় যাপিত বিলাসবহুল জীবনযাত্রা।
হে কবি,
ওই বস্তির সাধারন মেয়েটির কথা ভাববেননা!
যে সাধারন মেয়েটি প্রতি সন্ধ্যায় আঁচলের ফাঁকে অর্ধউন্মুক্ত মাংসপিন্ড ফেরি করে বিনিময়ে মায়ের ওষুধ,ভাইয়ের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফি এবং সপ্তাহঅন্তর আধা কেজি গো মাংস কিনে নেয়;
দয়া করে সেই সামান্য মেয়েটিকে নিয়ে আপনি যেই অসামান্য কবিতা লিখতে চেয়েছিলেন সেটা আর লিখবেননা।
আপনাকে ভুলে যেতে হবে এখন প্রকৃতি বিষাক্ত বাতাসে ভরপুর!
সাম্রাজ্যবাদের রোষের অনলে এখনও বুভুক্ষ হাড় জিরজিরে শরীর নিয়ে অপেক্ষমান ক্ষুধার্ত শিশু ;
পাতি নেতাদের চাপার জোরে মুষড়ে পড়ে আছে এক কোনায় স্বাধীনতা নামক পরিচিতিটা!
দোহাই আপনার কবি,
যদি পারেন তবে শুধু মেকি আড়ম্বরে আপনার কাব্যকথামালাকে সংযুক্ত করে ছাপিয়ে দিন মোটা কাগজে ;
দেখবেন রাতারাতি বিখ্যাতদের তালিকায় জ্বলজ্বল করবে আপনার নাম।
কি হবে বলুন মহামান্য,নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে!
তার চেয়ে বরং ভুলে যান এ পৃথিবীর কাছে আপনার যাবতীয় দায়বদ্ধতা,
ভুলে যান কতোটা তীব্র শেল বিঁধেছিলো আপনার বুকে বৃদ্ধ ঠেলাওয়ালার পিঠে অসহায়ত্বের জোয়াল দেখে।
আপনাকে ভুলে যেতে হবে মহামান্য কবি, আপনি কলম ছুঁয়ে কথা দিয়েছিলেন কালিকে,আমৃত্যু আপনি শোষিতের হয়ে শোষকের বিরুদ্ধে লিখে যাবেন।

🌹এখনো প্রেম বেঁছে আছে

আমাদের ব্যাস্ত নগরীতে এখনও প্রেম বাঁচে উভয় পারাপারে;
আধো অন্ধকারে প্রেমিক চেয়ে থাকে অপলক!
ঘুমন্ত প্রেয়সীর নাগের ডগায় জমে অব্যক্ত কিছু দ্বীর্ঘশ্বাস।
কোলাহল থেমে গিয়ে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া কংক্রিটের গালিচার ধারে সারি বেঁধে বসে থাকা কুকুরগুলো তবু নিঃশ্বাসে শুষে নেয় ঘ্রাণ, ক্ষুধা নিবৃত্ত উপাদানের;
তবু কোথায় যেন ভালোবাসারা ফিসফাস কথা বলে।
ভালোবাসারা জেগে থাকে অহেতুক প্রেম আহ্লাদে,
আমাদের ব্যাস্ত নগরীতে তবু এখনও প্রেম বাঁচে।
প্রেম বাঁচে প্রেমিকের দ্বীর্ঘশ্বাসে,
প্রেমিকার অপ্রাপ্তির আস্ফালনে প্রেম যেন আরো গাঢ় রংয়ে সাজে;
কখনও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রেমিকা ছুঁড়ে দেয় একরাশ ক্রোধ প্রেমিকের দিকে,
কখনও প্রেমিকের মৌন অভিশম্পাতে প্রেমিকার ঘুম ছোটে।
তবু কোথায় যেন প্রেমিকের যাবার আছে!
কে যেন অপেক্ষাতে তার আছে বসে।
অতঃপর সমস্ত অনুযোগ জলাঞ্জলি দিয়ে
তারা আবদ্ধ হয় সচেতন অঙ্গিকারে,
নিমেষেই মুছে যায় সকল দ্বিধা;
পরম নির্ভরতায় প্রেমিকার বুকে গোঁজে মুখ
যেন কোথাও কোন দূরত্ব ছিলোনা কোনোদিন,
যেন এভাবেই প্রেম বেঁচে ছিলো চিরদিন।
বলিহারি প্রেম!
বর্তমানের ব্যাস্ত নায়ের পারাপথে,
প্রেম ভাসায় তরী আপন মনে পাল তুলে।
আমাদের নগরীতে এখনও প্রেম আছে মুখোমুখী দুজনার অভিলাসে।

🌹উড়ে যাওয়া গাংচীল অথবা ভালোবাসা

অধীকারের অহংবোধে কেউ দাপুটে হুংকার ছাড়ে,
কেউবা নত হয় অনাহুত আকাঙ্খায়;
হাহ্ মেয়ে !
ভূলে যাও কি চেয়েছিলে,
ভূলে যাও একদিন অধিকার তোমারও ছিলো….
পৃথিবীর পথে পা মাড়িয়ে ফেলে যাও তোমার পায়ের ছোপ ;
দূর্বার অপ্রতিরোধ্য উচ্ছাসে ভাসাও যাবতীয় অভিমান।
তোমাকে আর কারো ইচ্ছাতে চোখে কাজল আঁকা মানায়না,
কেউ আসবে বলে প্রতিক্ষায় রত বেহালায় করুণ সুর..
অথবা বেখেয়ালে রিনঝিন কাচের চুড়ি!
শোনো মেয়ে,
কারও শানীত দৃষ্টির তিব্র লেহন তোমাকে যতই ঝাঁঝড়া করুক!
মনে রেখো একদিন তারই করতলে ঢেলেছিলে তুমি আকুন্ঠ স্নেহাষ্পদ।
তারা ভূলে যাক তুমি তাদের কে ছিলে!
ভূলে যাক বহুবার আপন পাঁজরের রক্ত চুইয়ে উর্বর করেছো তাদের শষ্যভূমি;
ভেবে নাও ভালোবাসায় না হোক,অকৃতজ্ঞতায় বরং রয়ে যাবে তুমি তাদের গোপন দ্বীর্ঘশ্বাসে।

Related Articles

Back to top button