ফিচারবিচিত্রা

পুরুষ নির্যাতন

এইচ বি রিতা: পারিবারিক সহিংসতা আমাদের সমাজে একটি বিরাট সমস্যা। অনেকেই ধারণা করেণ এই পারিবারিক সহিংসতায় কেবল নারীই ভুক্তভোগী। পুরুষ ও যে এই নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, তা আমরা চিন্তায় ও আনিনা। কারন পুরুষ মাত্রই শক্তিশালী, জেদী, নিষ্ঠুর, অত্যাচারী কিছু একটার প্রতিচ্ছবি আমাদের কাছে।

তবে সকল পুরুষ যেমন অত্যাচারী নন, তেমনি সকল নারীও কিন্তু ” দুধের ধোঁয়া তুলসি পাতা নন।”

পারিবারিক সহিংসতায় ভুক্তভোগী কেবল যে নারীই, তা নয়। দিন বদলেছে। পুরুষরা ও পারিবারিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। তবে নারী সহিংসতার বিষয়টিকে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে যতটা গুরুত্ব দেয়া হয় বা তার প্রতিরোধে যতটাই পদক্ষেপ নেয়া হয়, পুরুষ সহিংসতার বেলায় তা কিন্তু সম্পূর্ণই উপেক্ষা করা হয়।
দৃশ্যমান অথবা অদৃশ্য, নারী নির্যাতনের পাশাপাশি বাংলাদেশে এখন পুরুষ নির্যাতন ও যে একটি প্রকট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

যুগে যুগে পুরুষ ও সমাজ দ্বারা নারীরাই সাধারণত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন। যদিও কার্যকারীতা আপেক্ষিক, তবু নারী নির্যাতন নিরসনে আমাদের দেশে বিভিন্ন আইন ও মানবাধিকার সংস্থা , বিভিন্ন এঞ্জিও গুলো সর্বদাই সচেষ্ট। প্রতিদিন টিভি, নিউজ পেপার কিংবা প্রকাশ্যে চোখ খুলেই নারী নির্যাতনের চিত্র আমরা দেখছি। সেই অনুপাতে, পুরুষ নির্যাতনের বিষয়টা আমাদের সমাজে বহুল আলোচিত ও আলোড়িত নয়।

এর যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমতঃ পুরুষ দ্বারা নারী নির্যাতনের হার এতই বেশী ও নিত্য দৃশ্যমান যে এখানে “নারী দ্বারা পুরুষ নির্যাতন” সন্পূর্ণ টপিকটিই অনেকের কাছে তাচ্ছিল্যের বিষয়।
দ্বিতীয়তঃ পুরুষ নিজেই তার নির্যাতিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করতে চান না। কারণ আছে। আমাদের মাঝে প্রচলিত অনেকগুলি কুসংস্কারের একটি হলো, সর্বাবস্থায় একজন স্ত্রীকে তার স্বামী নিয়ন্ত্রন করবে। কোন স্বামী তা করতে অক্ষম হওয়া মানেই সেই স্বামী নুপুংশুক বা সে যৌন কর্মক্ষমতায় অক্ষম। আর তাই,তার স্ত্রী যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই স্বামীকে নাচালেও স্বামী ব্যাক্তিটি তা প্রকাশ করতে নিরাপত্তাবোদ করেননা।
নারীর তুলনায় পুরুষের ইগো বেশী। একজন নারী অবলীলায় তার নির্যাতনের কথা অন্যকে বলতে পারেন। কিন্তু একজন পুরুষ স্ত্রী দ্বারা নির্যাতীত হওয়ার ঘটনা কখনোই অন্যকে বলেন না। লজ্জা, বন্ধুমহলে আত্মসন্মান কমে যাওয়ার ভয়, সমাজে পুরুষ হিসাবে নিজের ক্ষমতা ও গর্ব ক্ষতিগ্রস্থ্য হওয়ার ভয়, নিজের পৌরুষত্ব নিয়ে প্রশ্নবিদ্ব হওয়ার ভয়…ইত্যাদি নানান কারণে পুরুষ তার নির্যাতিত হওয়ার বিষয়টি চেপে যান।

নির্যাতন কয়েক প্রকারের হতে পারে। শারীরিক, মানসিক, সামীজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি। তবে নারী যেমন শারীরিক,মানসিক,দৈহিক-আর্থিক ও সামাজিক ভাবে হরামেশাই নির্যাতিত হচ্ছেন, পাশাপাশি হচ্ছেন শাসন ও শোষণের শিকার, পুরুষের ক্ষেত্রে সেই নির্যাতন সম অনুপাত না হলেও, বর্তমানে অনেকটাই এগিয়ে আছেন।

দ্যা বেংগলী টাইম্স ডট কম সুত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে পুরুষ নির্যাতনের হার শতকরা ৪০ । তবে পুরুষ নির্যাতনের ধরণটি একটু আলাদা। পুরুষ সাধারণত শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে মানসিক নির্যাতনের শিকার হন বেশী।

যেমনঃ
১। ইমোশনালী ব্ল্যাকমেইল করে ভালবাসার বদৌলতে স্বামীকে তার মা-বাবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে বা আলাদা করে দেয়া। এতে পুরুষটি স্ত্রী/কন্যা/পুত্রকে ভালবাসার অযুহাতে দূরে সরে যান ঠিকই, কিন্তু সর্বাবস্থায় তিনি কষ্টে থাকেন।

২। পরিবারে ভাই বোন বা বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে কিংবা তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা করতে গিয়েও স্বামীকে অনেক সময় স্ত্রীর কটাক্ষ ও মৌখিক নির্যাতন সইতে হয়।

৩। নারী নির্যাতন দমন আইনে আপাত দৃষ্টিতে নারীর অধীকার সংরক্ষন ও ন্যায্য অধীকার সুনিশ্চিত করা হলেও, সে অধীকার কতটা আদায় হয়েছে তা রোজকার জীবন ব্যাবস্থায় আমরা দেখতে পাই। তবে সেই নারী নির্যাতন আইনকে হাতিয়ার করে কিছু কিছু নারী বা তাদের পরিবার যেভাবে আইনের ফালুদা বানাচ্ছেন, তা খুবই বেদনাদায়ক।

প্রায়শ না হলেও,মাঝে মাঝে চোখে পরে “কন্যাপক্ষকে পর্যাপ্ত অর্থ বা স্ত্রীর নামে বাড়ী-গাড়ী, সম্পদ লিখে না দেয়ার কারণে স্বামীকে তালাক/ নারী নির্যাতন মামলা করার ভয় দেখাচ্ছেন শশুর পক্ষ বা স্ত্রী নিজেই।”
এমনই একটি অভিযোগের কথা উল্লেখ্য করে স্ত্রীর নামে যৌতুকের মামলা করেছেন সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হসপিটালের রেজিস্টারকৃত ডক্টর এএসএম নাজমুল ইসলাম।

খবরটি দেখুন-
http://www.jugantor.com/last-page/2014/08/08/131921

৪। অন্যের বিলাসীতা দেখে, নিজের অবস্থানকে যাচাই করতে গিয়ে অনেক নারীই দেখা যায় স্বামীর প্রতি অসন্তুষ্টটা প্রকাশ করছেন। নানান ভাবে স্বামীর অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে খোটা দিচ্ছেন। এতে করে স্বামী হয় আত্মমর্যাদাহীনতায় ভোগেন কিংবা ভুল কোন সিদ্বান্ত নিয়ে বসেন। আর সে ভুলের মাশুল হয় ভয়ংকর।
এমনই এক ভুলের মাশুল দিয়ে গিয়ে চিটগংয়ে আমার পরিচিত এক বন্ধুর মেঝো ভাই ফাঁসী নিয়ে মারা যান। ভদ্রলোকের স্ত্রী তার স্বামীর অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতায় খুশী ছিলেন না। প্রায় স্বামীকে তিরস্কার করতেন, রাগ দেখাতেন। মুখ ভার করে রাখতেন। অতঃপর ভদ্রলোক এক সময় স্ত্রীর বুদ্ধিতে ভাইদের কথা অমান্য করে বাড়ী বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ব্যাবসা শুরু করেন। সে ব্যাবসার দায়ীত্ব তার স্ত্রী বুঝে নেন। ১ বছরের মাথায় ভদ্রমহিলা ব্যাবসায় লস করেন। এদিকে ব্যাংক চাপ দিতে থাকে পাওনা অর্থের জন্য। নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে ব্যাংক তার বাপের দেয়া একমাত্র বাড়ীটি নিয়ে যাবে বলে লিগ্যাল নোটিশ পাঠায়। ভদ্রলোক উপায়ন্তর না দেখে, এক রাতে ফাঁসী নেন। তার ভাই বোনরা ভাবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও ফল পাননি । কারন পুরুষের এ ধরনের মানসিক নির্যাতনের জন্য আমাদের দেশে কোন আইন নেই।

৫। কিছু কিছু নারীকে দেখা যায় স্বামী রেখে ফেইসবুকে কিংবা মোবাইলে অন্য পুরুষের সাথে প্রেমালাপ করছেন। যদিও উনারা এটাকে “ফ্রি ফ্রেন্ডশীপ” আখ্যা দিচ্ছেন। অনেকে পরকীয়া করছেন। স্বামী বাঁধা দিচ্ছেন। উনারা কানে নিচ্ছেন না। একদিন, দুইদিন, তিনদিন… এ নিয়ে বিশাল ঝগড়া হচ্ছে। অশান্তি চরম পর্যায়ে যাচ্ছে। এক সময় এই অবাধ মেলামেশা নিয়ে তর্ক বিতর্ক থেকে পুরুষের স্বভাব সুলভ আচরণে রাগের মাথায় উত্তেজিত হয়ে ঠাস-ঠুস ২/৪ টা দিয়ে বসিয়ে দিচ্ছেন স্ত্রীর গালে। আর তখনই নারী অধীকার সংরক্ষনে “নারী নির্যাতন দমন আইন” এসে টুটি চেপে ধরছে স্বামীর। গায়ে হাত তোলা অপরাধের শাস্তি হয়ে যায়, তার পিছনে অন্তর্নিহিত কারণটি প্রকাশ হয়না। হলেও লাভ নেই। পরকীয়া বা অবাধ বিচরণের জন্য ইসলামে আইন আছে, শাস্তি আছে। সামাজিক ও রাস্ট্রীয় ভাবে এর জন্য তেমন কোন আইন বা শাস্তি নেই।

৬। কেউ কেউ নিজ কু-রুচীপূর্ণ কামনা বা বাসনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ছোট খাটো বিষয় নিয়ে ইচ্ছে করেই স্বামীর সাথে ঝগড়া করছেন, অধৈর্য্য হয়ে পরছেন মুক্তির চিন্তায়। এ ক্ষেত্রে কখনো পরকীয়া জড়িত থাকে। কখনো কেবল মুক্তির আশা। দিন দিন সম্পর্ক এমন পর্যায়ে যায় যে কোন না কোন সময় স্বামীর পশুত্ব জেগে উঠে। শুরু করেন নির্যাতন। ব্যাস! আর যায় কোথায়?

৭। প্রতারনার দায়ে একজন পুরুষ ফেঁসে যান। নারী বেঁচে যান আইনত দিক দিয়ে।
আমার খুব পরিচিতএকজন বন্ধু ৭ বছর প্রেম করেন। শারীরিক সম্পর্ক ও করেন। শেষ পর্যায়ে বিয়ের আগের দিন গায়ে হলুদ পরিয়ে কন্যা নিজেই বিয়ে ভেঙ্গে দেন। কারন বন্ধুটি মধ্যবিত্ত। কন্যার চাহিদা মত সোনার গহনা ও নগদ ২ লাখ টাকা দিতে পারছেন না। ১ সপ্তাহের মাথায় কন্যা আরো একটু পয়সাওয়ালা একজনের গলায় ঝুলে পরেন। এমন কি কন্যা এখনো, তার স্বামী যৌন ক্ষুদা মিটাতে পারেনা বলে, বন্ধুটির কাছে আসার আকুতি জানান।
আজ যদি ঘটনাটি উল্টো হতো, যদি এই প্রতারনা বন্ধুটি করতো কন্যার সাথে, তাহলে সে ফেঁসে যেত। তাকে বিয়ে করতেই হতো। পরিবার, সমাজ, আইন…সব কন্যার পক্ষে যেত। কিন্তু এত বড় দুঃসহ বেদনা আর প্রতারণা সয়েও, বন্ধুটি নীরবে চোখের জল ফেলে। মেয়েটির কোন ক্ষতি করার চিন্তা করছেনা। এটা কি নির্যাতন নয়?
অন্যদিকে, এই যে মেয়েটি তার স্বামীর আড়ালে, পুরাতন বয় ফ্রেন্ড এর সাথে যৌন ক্ষুদা মিটাতে ব্যাকুল হচ্ছে, সেটা কি একজন স্বামীর প্রতি অবিচার নয়? নির্যাতন নয়?

৮। কালে কালে যুগে যুগে সকল শ্রেনির নারীই নির্যাতিত হয়ে আসছেন। নিন্মবিত্ত , মধ্যবিত্ত , উচ্চবিত্ত সর্বক্ষেত্রে।
যারা নিন্মবিত্ত শ্রেনির অর্থাৎ রিকশাওয়ালার স্ত্রী-কন্যা, দিন মজুর, গার্মেন্টস শমিক, কৃষক, কুলী পরিবারের অন্তর্গত, খেটে খাওয়া নিন্মশ্রেনীর নারীরা কিন্তু বছরের পর বছর স্বামীর অত্যাচার সয়েই যাচ্ছেন। তারা নারী নির্যাতন দমন আইন সম্পর্কে খুব একটা জ্ঞান রাখেন না। রাখলেও স্বামীর বিরুদ্ধে গিয়ে সমাজের চক্ষুশূল হওয়ার মত সাহস তারা রাখেন না।
ঘাপলা বাঁধছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শিক্ষিত শ্রেনিতে। এখানে দেখা যায়, নির্যাতিত নারী যেমন স্বামীর অন্যায়ের বিরুদ্বে রুখে দাঁড়াতে শিখেছেন, আবার কিছু সংখ্যক নারী নিজের সুবিধার্থে অন্যায় ভাবে “নারী নির্যাতন দমন আইনে” স্বামীকে ফাঁসিয়ে নিজের ফায়দাও লুটছেন।

সমাজে পুরুষ ও নারী উভয়ই নির্যাতিত । যদিও নারী নির্যাতন প্রকট, পুরুষ নির্যাতন কম, কিন্তু অদৃশ্য হলেও আছে। যতটাই আছে, তার প্রতিকার দরকার। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং আইনি ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে শুধু নারীই নির্যাতিত, বিষয়টি এমন নয়।

পুরুষের ইগো সমস্যা, সামাজিক ব্যাবস্থা ও রাষ্ট্রীয় ব্যাবস্থায় পুরুষ নির্যাতনের জন্য আইন প্রনয়নের ঘাটতি ও স্বীকৃতির কারণে আজ কিছু নীতি বহির্গত নারী এই আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে অনেক বিনম্র পুরুষের জীবন বিপর্যস্তত করে তুলছেন। কিন্তু নির্দোষ পুরুষ এখানে দূর্বল। নির্যাতিত হয়েও তারা আইনী কোন সহায়তা পাচ্ছেন না।

আমি মনে করি, নারী নির্যাতন দমন আইনের পাশাপাশি, পুরুষ নির্যাতন দমন আইন পাস করা হলে এবং কেবল মুখের কথায় কোন একশনে না গিয়ে উপযুক্ত প্রমানাদি সহকারে যদি এই “নারী ও পুরুষ নির্যাতন দমন আইন” কে সঠিক ভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে এখানে দুই শ্রেনিই তাদের ন্যায় বিচার পাবে এবং কেউ নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে অন্যকে ফাঁসানোর সুযোগ পাবেনা। অপরাধ ও কমে আসবে।

আইন হোক সকলের জন্য সমান। শাস্তি হোক সকল অপরাধীর। হোক নারী, হোক পুরুষ, নির্যাতিত সকলের ব্যাথা উপশম হোক। সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হোক।

Related Articles

Back to top button