লিড নিউজসিলেট

যেসব কারণে সিলেটে আসন বঞ্চিত জামায়াত

বিশেষ প্রতিবেদক: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগের মধ্যে সিলেট-০৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) ও সিলেট-০৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) দুটি আসন চেয়েছিল জামায়াত।

সিলেট-০৫ আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী যিনি পাঁচ বার জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছেন এবং ২০০১ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কানাইঘাট-জকিগঞ্জে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা। ১৯৯৬ এর নির্বাচনে তিনি মাত্র এক হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৭৮,০৬১ ভোট পেয়েছিলেন, ঐ নির্বাচনে আ’লীগের প্রার্থী ১০৯,৬৯০ পেয়ে পাশ করেছিলেন।

অপরদিকে বিয়ানীবাজার-গোলপগঞ্জে আসনে জামায়াতের দক্ষিণ জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদের সাথে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। তখন তিনি পেয়েছিলেন প্রায় ৫২ হাজার ভোট। সেই সুবাদে জামায়াত চেয়েছিল এবার উক্ত দুটি আসনে ঐক্যফ্রন্টের সমর্থনে নির্বাচন করার।

কিন্তু জামায়াত ইসলামী শেষ পর্যন্ত জোটগত ভাবে এই দুটি আসন পায়নি। এতে মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন সিলেটের জামায়াতের এই দুই শীর্ষ নেতা। ফলে দলের নেতাকর্মী ও জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সিলেট বিভাগের মধ্যে জামায়াত কোনো আসন পায়নি এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সচেতন মহল মনে করেন জামায়াতের রাজনৈতিক অদূরদর্শীতাই এর মূল কারণ।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, যেসব কারণে সিলেট বিভাগে জামায়াত আসন পায়নি। সেগুলো হলো-

১. সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে সিলেটে জামায়াতের সাথে বিএনপির চরম দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি যেকোনো মূল্যে সিলেটের রাজনীতিতে জামায়াতকে মাইনাস করতে চেয়েছিল। সেটারই প্রতিফলন ঘটেছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটে আসন বন্টনে।

২. জানা গেছে, জামায়াতের মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ও মাওলানা হাবিবুর রহমান একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের তালিকায় রয়েছেন। এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম কিছুদিন আগে বলেছিলেন, কোনো যুদ্ধাপরাধীর হাতে ধানের শীষ প্রতিক তুলে দিবেন না। একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধে বিএনপির জিরো টলারেন্স এ নীতির কারণে সিলেটে আসন বঞ্চিত হতে হয়েছে জামায়াতকে।

৩. বরাবরই পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে জামায়াতের সম্পর্ক অত্যন্ত নাজুক। তাই সীমান্তবর্তী জনপথ গুলোতে জামায়াতের প্রার্থী না দিতে ভারতের কঠোর হুঁশিয়ারী রয়েছে। আর সিলেট-০৫ ও সিলেট-০৬ আসন অনেকটাই সীমান্তবর্তী তাই সিলেট বিভাগে আসন বঞ্চিত হতে হয়েছে জামায়াতকে।

৪. সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর সাথে সিলেট-০৫ আসনের প্রার্থী জামায়াতের মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর দূরত্ব ঐতিহাসিক সত্য। দু’জনের বাড়িই সিলেটের কানাইঘাট। সিলেট-০৫ আসন সহ বিএনপির নেতাকর্মীরা পুরোনো সেই সম্পর্ককে সিলেটের আসন বন্টনে কাজে লাগিয়েছেন। সিলেট-০৫ আসনে এক্ষেত্রে বিএনপির জেলা সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, কানাইঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি মামুন রশিদ (চাকসু মামুন) এবং কানাইঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীকে দায়ী করছেন অনেকেই।

৫. জামায়াতের বর্তমান কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল ডা: শফিকুর রহমান সিলেটের ব্যক্তি। তিনি সিলেট, মৌলভীবাজার সহ বিগত দিনে বিভিন্ন আসনে নির্বাচন করলেও কখনো সংসদ সদস্য হতে পারেননি। অথচ উনার স্ত্রী জামায়াতের সংরক্ষিত মহিলা আসনে একবার সংসদ সদস্য ছিলেন। জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, তিনি মাওলানা হাবিবুর রহমান কিংবা মাওলানা ফরিদ চৌধুরী কাউকেই তাই চান না এমপি নির্বাচিত হোন। সিলেটে কেউ মনোনয়ন না পেলেও সিলেটের ব্যক্তি ডা: শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে নির্বাচন করছেন দেখে এই সন্দেহ আরও দানা বেঁধে উঠেছে।

৬. সিলেটের এই দুই জামায়াত প্রার্থী দলের নিবন্ধন হারিয়ে ধানের শীষ প্রতিক নিয়ে মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন। বিএনপি অন্যান্য আসনে একক কোনো প্রার্থী দেয়নি যদি একজনের মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায় তখন অন্য প্রার্থী যেন নির্বাচন করতে পারেন। এক্ষেত্রে জামায়াত একক প্রার্থী দিয়ে সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছে। সতন্ত্র কিংবা একক প্রার্থী না দিলে বিএনপিকে হয়তো চাপে রাখা যেতো। ধানের শীষ নিয়ে মনোনয়ন দাখিল করায় জামায়াত ঐক্যফ্রন্টের সমর্থন না পাওয়ায় সতন্ত্র প্রার্থীও দাড় করানোর সুযোগ পায়নি।

৭. জামায়াতকে ঐক্যফ্রন্ট থেকে ২৫টি আসনে প্রথমে ছাড় দেওয়া হয়েছিল। জামায়াত এই আসন গুলো পাবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে ৩টি আসন বিএনপি কেড়ে নেয়। সিলেটে জামায়াতের আসন না পাওয়ার পিছনে বিএনপির বিশ্বাসঘাতকতাকে সবচেয়ে বেশী দায়ী করছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের নেতাকর্মীরা বলেন, রাজনৈতিক কৌশলে জামায়াত পরাজিত হয়েছে। তারা বলছেন, দীর্ঘ দিনের গড়ে ওঠা আসন দুটি এবার হাতছাড়া হলো। এজন্য জামায়াত নেতাদের দোষারোপ করছেন তারা।

সবমিলিয়ে সিলেট অঞ্চলে জামায়াতের রাজনীতি তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে। সংকট নিরসনে আপাতত সবাই ৩০ তারিখের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু একটি বিষয় সবার কাছেই পরিষ্কার সিলেটে আগামী নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট সেভাবে জামায়াতকে ভোটের মাঠে পাবে না। জামায়াত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন সিলেটে বিভাগে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করার পুরো দায়িত্ব বিএনপির। তাদের কোনো দায় নেই।

Related Articles

Back to top button