এবার ‘বৈশাখী মেলা’ হচ্ছে সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামে


নিউজ ডেস্ক : সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে মাস ব্যাপী বৈশাখী মেলা। আগামী পহেলা বৈশাখ থেকে এ মেলা শুরু হবার কথা রয়েছে। তবে একটি আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে মাস ব্যাপী মেলার আয়োজন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিলেটের ক্রীড়ামোদি ও সচেতন মহল।
তাদের দাবী একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামে কোন ধরণের মেলা আয়োজন হতে পারে না। যেখানে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকে সেখানে কিভাবে মাস ব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়।
এদিকে দেশের বর্তমান অবস্থায় মাস ব্যাপী মেলার আয়োজনের অনুমোদন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কিভাবে অনুমোদন দেন এ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। অনেকেই বলছেন, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের একটি স্বপ্ন এই আন্তর্জাতিক মাঠ।
এই মাঠের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে তিনি অনেক পরিশ্রম করেছেন। সেই মাঠে মেলার এই আয়োজন অর্থমন্ত্রীর ভ‚মিকাকেও অসম্মান করা হচ্ছে। পাশাপশি দুদিন পরপর এসব মেলার আয়োজনের ফলে সিলেটের ব্যবসা বাণিজ্যে মন্দাভাব দেখা দিচ্ছে। মেলার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীরা নানান সময় আন্দোলন করেছেন। কিন্তু মেলা বন্ধ না করে আবার মেলার আয়োজন ব্যবসায়ীদের সাথে অনেকটা তামাসার মতো।
সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ বেনারশী মুসলিম এন্ড জামদানি সোসাইটির ব্যানারে ও সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার উদ্যেগে মাস ব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার মেলা উপলক্ষে গঠিত উপ-কমিটির দায়িত্বে বিসিবির পরিচালক ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল রয়েছেন।
এদিকে মেলা আয়োজকদের দাবী যথাযথ ভাবে সংশ্লিষ্টদের অনুমোদন নিয়ে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। সরজমিন লাক্কাতুরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গিয়ে দেখা যায় মেলার বিভিন্ন স্টলের জন্য স্টেডিয়ামের অভ্যন্তরে বাঁশের খুটি দিয়ে সাজানো হচ্ছে। স্টল তৈরির কাজে থাকা ডেকোরেটার্স মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে মেলা চলবে আগামী পহেলা বৈশাখ থেকে মাস ব্যাপী। মেলার আয়োজক সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানান শুধু মঈন খান বাবলুর নির্দেশে এ স্টল সাজাচ্ছেন। এর বেশী আর কিছু জানেন না বলে জানান তারা।
সিলেটের বেশ কয়েকজন ক্রীড়ামোদীদের সাথে আলাপকালে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিসিবির এক কর্তা নিজের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মাস ব্যাপী মেলা আয়োজনের অনুমোদন দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেলার আয়োজক মঈন খান বাবলু সিলেট অঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে মেলার আয়োজন করে থাকেন। এর পূর্বেও তিনি সিলেট আখালিয়া বিজিবি মাঠ ও সদর উপজেলা মাঠে আন্তর্জাতিক মেলা নামে বিভিন্ন মেলার আয়োজন করেছেন। কোরবানীর ঈদেও পশুর হাটের আয়োজন করে থাকেন সে সব মাঠে। সম্প্রতি সিলেট সদর উপজেলা মাঠে সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বারের উদ্যেগে আয়োজিত বাণিজ্য মেলা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মাস ব্যাপি মেলার আয়োজন বৈধ কিনা জনতে চাইলে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ভ্যানু ম্যানেজার জয়দীপ দাশ সুজক মাস ব্যাপী মেলা আয়োজনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আমি বাইরে ছিলাম এ ব্যাপারে বিসিবির পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ভালো বলতে পারবেন।
এ ব্যাপারে মেলার আয়োজক মঈন খান বাবলু বলেন, সিলেট বিভাগীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মাঠ যেহেতু বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার তাদের সহযোগীতায় মেলার আয়োজন করা হয়েছে।
মেলার মূল আয়োজক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো মেলার অনুষ্ঠান কি থাকবে তা সঠিক ভাবে বলা যাচ্ছে না। প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে মেলায় অনুষ্ঠান সাজানো হবে বলে জানান তিনি। মেলার সম্পর্কে আর কিছু জানার থাকলে বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার মেলা আয়োজনের উপ কমিটির শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
এ ব্যাপারে বিসিবির পরিচালক ও সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল জানান, শর্তসাপেক্ষে এখানে মেলা আয়োজনে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আমরা নিজেরা কোনো মেলার আয়োজন করিনি আমরা কেবল স্টেডিয়ামের পার্কিং মেলার জন্য ভাড়া দিয়েছি। আয়োজকরা একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন সেই প্রস্তাবের আলোকে বিসিবি, এনইসিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সাথে আলাপ আলোচনা করে এই অনুমোদন দেয়া হয়। তবে তাদের মাঠ বা স্টেডিয়ামের মূল কাঠামোতে কোনো অনুমোদন দেয়া হয়নি, দেয়া হয়েছে স্টেডিয়ামের পার্কিং। ঠিক যেভাবে কিছুদিন আগে একটি সামাজিক সংগঠনকে তাদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন করতে দেয়া হয়েছিলো। স্টেডিয়ামের মূল কাঠামোর বাইরে বিভিন্নভাবে সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছে, আকর্ষণীয় করা হয়েছে। এটা এজন্যই করা হয়েছে যাতে করে যখন কোনো খেলার আয়োজন না থাকে তখন যাতে তা ভাড়া দিয়ে বাড়তি কিছু আয় করা যায়। এটা কেবল মেলা নয় যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান এখানে যেকেউ অনুমোদন সাপেক্ষে করতে পারবেন। আর এই আয় স্বচ্ছ ভাবেই হয়ে থাকে। এটা করা যায়। অন্যান্য সব স্টেডিয়ামেই এটা করা হয়ে থাকে।
এসময় নাদেল বলেন, একটি স্টেডিয়ামের জন্য অনেক খরচ লাগে। কিন্তু মূল কর্তৃপক্ষ থেকে এর সামান্যই যোগান দেয়া হয়, বাকিসব খরচ স্পন্সর বা স্টেডিয়ামের সম্পদ ভাড়া দিয়ে আয় করতে হয়। যারা এই আয়কে অবৈধ বা প্রশ্নবিদ্ধ মনে করেন তাদের সেই বাড়তি খরচের টাকা দিয়ে তবে কথা বলতে বলেন নাদেল।
সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশের মূখপাত্র ও অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার জেদার আল মুসা জানান, মাস ব্যাপী মেলার আয়োজনের ব্যাপারে শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে শর্তে কি কি রয়েছে তা তিনি সবগুলো এ পর্যায়ে অবগত নান বলে জানান। তিনি বলেন বৈশাখী উৎসবের ক্ষেত্রে সকাল থেকে বিকেল ৫ টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আর আন্তর্জাতিক এমন একটি স্টেডিয়ামে মেলার আয়োজন কতোটা যৌক্তিক জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সিলেট জেলা সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী জানান, এটি খুবই দুঃখজনক ঘটনা। আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম একটি স্পর্শকাতর জায়গা। এখানে নিরাপত্তা এবং এর সৌন্দর্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি জায়গায় মেলার আয়োজন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে এই মাঠের মান এবং গ্রহণ যোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। বার্ণিজ্যিক দিক বিবেচনায় মেলার আয়োজন করে এই স্টেডিয়ামের ক্ষতিসাধন করা হবে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আন্তরিকতা এবং পরিশ্রমের ফসল এই স্টেডিয়াম। তিনি জানলে এরকম একটি জায়গায় এমন আয়োজন কোনো ভাবেই হতে দিতেন না বলে মনে করেন তিনি। এটি নিশ্চই অর্থমন্ত্রীর অগোচরে করা হচ্ছে। তাছাড়া এভাবে মেলার ফলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পরবেন। এর আগেও অনেক জায়গায় এধরণের মেলা ব্যবসায়ীদের লোকসানে ফেলেছে। আমাদের সুন্দর সুন্দর মাঠ গুলো এসব মেলার আয়োজন করে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। এবার বিভাগীয় স্টেডিয়ামের দিকে চোখ দেয়া হয়েছে। এটা সিলেটবাসীর জন্য সুখকর নয়।




