লিড নিউজ

মায়ের লাল টকটকে মােরগ ও রণাঙ্গনের মুক্তিযােদ্ধারা

আহমেদ বকুল: মায়ের লাল টকটকে মােরগ দুটাে তরতর করে বড় হচ্ছে। নিয়ম করে মা মােরগ দুটােকে খাবার দেন। প্রতি বছর একজােড়া মােরগ মা অনেক বড় করেন। একেকটার ওজন হয় পাঁচ ছয় কেজি। এক সময় পুরাে বড় হয়ে গেলে তাদের জবাই করা হয়। এই সময় কয়েকজন নিকট আত্বীয়কেও দাওয়াত করা হয়। এই মোরগ জােড়ার প্রতি আমারও বিশেষ দৃস্টি থাকে। প্রতিদিন দেখি তাদের বেড়ে উঠা। মা কে বলি, মা-কবে মােরগ জবাই করবে? মা বলেন,আরও বড় হােক তারপর। আমি মােরগ জােড়ার বড় হওয়ার প্রতীক্ষা করি। আমার জিবে লালা ঝরে! মোরগ যে খাচ্ছি না তা নয়। এই রাওয়াল মোরগ বড় হলে তা জবাই করে মা এক বিশেষ পদ্ধতিতে রাধেন। আত্বীয় স্বজন মিলে মজা করে খাওয়া- দাওয়া হয়। কয়েক দিন থেকে আমার তর সইছে না। মাকে বলি, মােরগ জবাই করতে। মা বলেন, সবুর করো খােকা। আরও একটু বড় না হলে খেতে স্বাদ লাগবে না। আমি দেখি মোরগ জােড়া অনেক বড় হয়ে গেছে। মায়ের এই তাল বাহানা ভালো লাগে না। অভিমান করি। ভাবি, মা এই মােরগ জবাই করলে খাবই না।

পুকুর পাড়ে বিরাট বড় একটি শিমুল গাছ ছিল। সামনে মাঠ। ফাগুনে আগুনের মতাে লাল হয়ে যেত গাছের প্রশাখা আমি ছিলেম এই গাছের বাল্যবন্ধু, কথা বলার সাথী একাত্তরের কােন একদিনে শিমুল গাছের তলে মার্বেল খেলছি, হঠাৎ দেখি সামনের যুগীকােনা গ্রামে আগুন লেগেছে
দাউ দাউ করে জ্বলছে ঘরবাড়ি,পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে পুরো গ্রাম!
যুগিকােনা গ্রাম কুশিয়ারা নদীর তীরে যেন এক পটে আঁকা ছবি!
ঘরে আগুন লাগলে নেভাতে আসে পাড়া প্রতিবেশি  কিন্ত না, সবাই পালাচ্ছে, শিশু – বৃদ্ধ, নর- নারীর চিৎকারে বাতাস ভারি  জান নিয়ে পালিয়ে আসছে আমাদের গাঁয়ে। আমাদের পুকুরপাড় দিয়ে ঢুকল গ্রামের মানুষ। জানা গেল, রাজাকার গ্রামে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।

গ্রামের গৃহহারা মানুষগুলোকে আশ্রয় দিয়েছিল আমাদের গ্রাম কেশর পাড়ার লোক। আমার পূর্বপুরুষ এই পােড়া গাঁয়ের চল্লিশ পরিবারকে গৃহ নির্মানের জন্য দিয়েছিলেন অার্থীক অনুদান।
আমাদের বাড়িতে প্রায়ই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হতাে কৃপাময় ছিলেন অনুঘটক, তিনি নিয়ে আসতেন অনেক অচেনা মানুষ; বাবা চাচারাও বসে এক সাখে শলাপরামর্শ করতেন হতাে খানাপিনা।
একদিন আকাশে সাতটি যুদ্ধ বিমান ববিকট শব্দে কয়েক চক্কর খেল বিমানের ডাকে কান ফেটে যাওয়ার অবস্থা।
আমরা তিন ভাইকে মাটিতে উপােড় করে শুয়ানো হলো যুদ্ধ বিমানের মহড়া থামলে একটি খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল,রাতে হানাদার বাহিনী আমাদের এলাকায় অভিযান চালাবে।
সবাই ভয়ে অস্থির! সিদ্ধান্ত হলো নারী ও শিশুদের গ্রামের ভেতর জঙ্গল ঘেরা ছােট এক বাড়িতে রাখা হবে।
পুরুষ দেবে গ্রাম পাহারা। রাতে ছােট একটি রোমে গাদাগাদি করে গ্রামের সকল নারী শিশুকে ঢুকানো হলো  মা তখন অন্তঃসত্বা।
ঘর অন্ধকার করে সকল মা ছুরা ইয়ছিন পাঠ করছেন। মা আমাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে রেখেছেন, আমার উপর পড়ছে মায়ের চােখের পানি। বিনিদ্র রজনী কাটলো কােন দুর্ঘটনা ছাড়াই। একাত্তরের প্রতিটি মূহুর্ত ছিল ভয়ের আতংকের! বাড়ির কাছে বহমান কুশিয়ারা নদী।
প্রতিদিন ভেসে যেত লাশের পর লাশ!
আঁজলা ভরে জল খাওয়া হতাে না, র্দুগন্ধে বমি আসত মাকে শুধাই,এত লাশ কােথা থেকে আসে?
উজান থেকে আসে, বাঙালিদের লাশ মায়ের চােখ ছলছল করে ওঠে– কাঁপা কণ্ঠে বলেন,পাক হানাদার দেশে গণহত্যা করছে, গণ হত্যা কি মা?
যে-যুদ্ধে সাধারণ মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়।
আমি এসব বুঝিনা, কতই বা আর বয়স!
একদিন রাতের শেষ প্রহরে মা ডাকলেন,খােকা উঠে দেখ, কারা এসেছে!
মায়ের ডাকে ধড়মড় করে উঠে বসলাম
ঘরে কারা কথা বলছে!
অনেক মানুষের ফিসফিস আলাপ।
সাথে বাবা ও চাচার গলার স্বর শােনে দরজা ফাঁক
করে তাকাই, দেখি তের জন লােক গােল হয়ে বসা
পরনের লেবাছ জীর্ন শীর্ন কিন্ত চােখে বিজয়ের ঝিলিক!
মা কানে কানে বলেন, ওরা মুক্তিযোদ্ধা
আজ একটি বড় যুদ্ধ করে এসেছে।
কোথায় যুদ্ধ করেছে, মাকে প্রশ্ন করি
‘শেরপুরে’- আমাদের গ্রাম থেকে অনেক ভাটিতে।
চােখ বড়বড় করে দেখি; সদ্য যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা মুক্তিযােদ্ধাদের! আড়ালে থেকে শুনি, তাদের যুদ্ধ জয়ের গল্প।
কি দিয়ে যুদ্ধ করল মা?
অস্ত্র দিয়ে।
অস্ত্র কােথায়?
মা বলেন (উগারে) ভাড়ারে রেখেছে।
আমি দেখতে চাই।
মা বলেন, উগারে উঠ, আমি লেম (বাতি) দেখাচ্ছি।
উগারে উঠি, দেখি সাঝিয়ে রাখা রাইফেলস।
গুনে গুনে দেখি তেরটি।
লেমের আলােতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি–
মা বলেন, বন্দুকে টিপাটিপি করিস না।

আমি একরত্তি ছেলে,রাইফেলে হাত রেখে
তবুও উষ্ণ হই, আমার ও যুদ্ধে যেতে ইচ্ছে করে–
বাবা ডাকলেন, ভেতরে আয়।
আমি ভয়ে বিষ্ময়ে তাদের সামনে গেলাম!
বাবা মুক্তিযােদ্ধাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
ওরা আমায় আদর করল।
একজন আমাকে বুকে চেপে ধরে কেঁদে উঠলেন!
জানাগেল, আমার মতাে তার একমাত্র ছেলেকে ফেলে
যুদ্ধে এসেছেন!
আমি তাদের বলি, একটি অস্ত্র আমাকে দিয়ে দিতে,
সবাই বলে কেন?
আমিও যুদ্ধে যাবাে; যুদ্ধ করতে তাে অস্ত্র লাগে
আমার কথা শুনে সবাই অবাক!
বলে, বড় হও খােকা; তারপর যুদ্ধে যাবে
আমরাই তােমাকে অস্ত্র দেবাে।
অস্ত্রগুলোর নাম জানতে পারি ‘থ্রি নট থ্রি’।
ঘরে মাংস রান্না হয়েছে। বাতাসে রান্না করা মাংসের সুগন্ধ!
মা কে বলি,কি রেধেছ মা
মােরগ রাধছি। মায়ের জবাব।
তােমার সেই রাওয়াল মোরগ?
হ্যারে, দুটােই জবাই করেছেন তাের বাবা-
লোকগুলো কতদিন খায়নি ভালো খাবার!
আমার অভিমান হয়
আমি কতদিন থেকে বলছি বড় মােরগ খাবাে
মা বলছেন, আরাে বড় হােক
তারপর–
এই অজানা অতিথিদের দেখে মায়ের মােরগ বড় হয়ে গেল!
তীব্র অভিমান নিয়ে শুয়ে পড়লাম।
বাবা এসে টেনে তুললেন,
মুক্তিযােদ্ধারা খেতে বসেছে
আমাকেও তাদের সাথে খাবার খেতে বলা হলো
বাবার ভয়ে খেতে বসলাম
কিন্ত আমি চরম বিষ্ময়ে হা করে তাকিয়ে থাকলাম
ওদের খাবার খেতে দেখে!
সামনে খাবার পেয়ে মুক্তিযােদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে
গাে গ্রাসে খাচ্ছে।
যেন জন্ম- জন্মান্তর ধরে খেতে পায়নি!
মায়ের লাল টকটকে রাওয়াল মােরগ
যুদ্ধ করে আসা মুক্তিযােদ্ধাদের উদর-পূর্তী করল!
মায়ের উপর থেকে সব অভিমান প্রত্যাহার করে নিলাম।
মুক্তিযুদ্ধে মায়েদের শ্রম বৃথা যায়নি।
এইত আমার দেশ জননী
এই তাে আমার মুক্তিযুদ্ধ
এই তাে আমার স্বাধীনতা
এই তাে আমার বাংলাদেশ।

(শেরপুর অপারেশন শেষ করে রাতের শেষ প্রহরে আমার এক মুক্তিযােদ্ধা খালাত ভাই ১৩ জন মুক্তিযােদ্ধাকে সাথে নিয়ে আমাদের বাড়িতে খাবার খেয়ে চলে যান। আর কখনো তাদের সাথে দেখা হয়নি।
হয়তাে কেউ বেঁচে আছেন নয় তাে অনেকেই শহীদ হয়েছেন। কিন্ত আমার কৈশরেে দেখা রণাঙ্গনের মুক্তিযােদ্ধাদের প্রতি রইল অপরিসীম ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধা)

Related Articles

Back to top button