সিলেটেই এবার খোঁজ মিলল দুধের গ্রামের


গোলাপগঞ্জ প্রতিনিধি : সিলেটেই এবার খোঁজ মিলল দুধের গ্রামের। যেখানে দুধ বিক্রি করে বদলে গেছে দু’গ্রামের ভাগ্যের চাকা। এ দু’ই গ্রাম সকলের কাছে দুধগ্রাম ও আবাদিপাড়া হিসেবে পরিচিত। এ গ্রামগুলো হচ্ছে কালীকৃষ্ণপুর ও ইসলামপুর। উপজেলার সবচেয়ে সুবিধা বঞ্চিত লোকের বসবাস এই দু’ই গ্রামটিতে। এ পর্যন্ত দুধ বিক্রি করে এই গ্রামের শতাধিক পরিবারে ভাগ্যের পরিবর্তন এসেছে। ফিরে এসেছে তাদের মুখে হাসি।
এসব অধিবাসীরা প্রায় ২০০ বছর আগে দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে তাদের পূর্ব পুরুষরা পাড়ী জমান গোলাপগঞ্জের কালীকৃষ্ণপুর ও ইসলামপুর গ্রামে। এবং বসতিও শুরু করেন। এক সময় তাদের পূর্ব পুরুষদের কোন সহায় সম্বল ছিল না। মাছ ধরা এবং কৃষি কাজ করা ছিল তাদের প্রধান পেশা। ক্রমে তারা গোবাদি পশু লালন পালন শুরু করে। এক সময় তারা পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে কলসি দিয়ে গ্রামে গ্রামে দুধ বিক্রি করত। কিছুদিন পর গ্রামে গ্রামে যাওয়া বন্ধ করে নিজেদের গ্রামে গড়ে তুলে দুধের হাট বাজার। এ বাজারেই দুধ বিক্রি করে তারা এখন সকলেই স্বাবলম্বী।
গোলাপগঞ্জ উপজেলার শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের কালিকৃষ্ণপুর ইসলামপুর এলাকার দুটি গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছে এ দুধের বাজার। কিছুদিন পর এ দুধ বাজার আবাদিপাড়া দুধ বাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে সকলের কাছে। সারা বছরই এ বাজারে দুধ পাওয়া গেলেও শুকনো মৌসুমে খুব বেশি দুধ নিয়ে দুধওয়ালারা বাজারে আসেন। এ সময় বাজারও খুব জমে উঠে। এছাড়া বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের বেচাকেনা হয় সব সময়।
কালিকৃষ্ণপুর ইসলামপুর গ্রামের সহস্রাধিক গরুর মালিকদের সমন্বয়ে গড়ে উঠা দীর্ঘদিনের এ দুধের বাজারে প্রতিদিন ১৫/২০ মণ দুধ কেনা-বেচা হয়ে থাকে। প্রতিদিন এই বাজারে প্রায় ১ টনেরও বেশি দুধ আমদানি ও রপ্তানি হয়। দেশি গরুর দুধ কিনতে প্রতিদিন সকালে উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন ভীড় করেন এই বাজারে। এই বাজারে দুধের হাট শুরু হয় সকাল ৭টায় ও শেষ হয় ৮টা থেকে সাড়ে ৮টায়। তবে দুধের প্রধান গ্রাম হচ্ছে কালীকৃষ্ণপুর।
কালিকৃষ্ণপুর ইসলামপুর গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারে রয়েছে ৮/১০টি গাভী গরু। এ দুই গ্রামের আধিবাসিরা গরু পালনের পাশাপাশি কৃষি কাজেও পিছিয়ে নেই। দুধ বিক্রির পর কৃষি কাজে নেমে পড়েন। তাছাড়া বর্ষাকালে মাছ ধরা, বিক্রি করাও তাদের অন্যতম পেশা।
ইসলামপুর গ্রামের মৃত মুগল মিয়ার ছেলে ইব্রাহীম (৬০) জানান, তার ২০টি গাভী গরু ও ৯টি মহিষ রয়েছে। ২৯টি গবাদি পশু পালনের জন্য তিন’জন লোকও রয়েছেন। প্রতিদিন তিনি ১৬০/১৭০ লিটার দুধ বিক্রি করতে পারেন। যার বাজার মূল্য আনুমানিক ৬ হাজার থেকে ৬ হাজার ৮শত টাকা। প্রতি লিটার দুধ বিক্রি করেন ৩০/৩৫ টাকা করে। সে প্রতি মাসে ১ লাখ ৯২ হাজার টাকার মত দুধ বিক্রি করতে পারে। খামারের কর্মচারীসহ সব মিলিয়ে ব্যয় হয় ৫০/৬০ হাজার টাকা। দুধ বিক্রি করে তার বাৎসরিক আয় হয় লাখ টাকার উপরে।
সে আরো জানায়, খামারি ব্যবসার পাশাপাশি কৃষি মৌসুমে কৃষি কাজ ও বর্ষা মৌসুমে মাছ ধরে। তার বাপ দাদার আমল থেকে গরু পালন করে আসছে। দেশি গরুর খামারের মাধ্যমে দুধ বিক্রি করে মধু মিয়া নামে তার বড় ছেলেকে প্রবাসে পাঠিয়েছেন। তাছাড়া ৪ ছেলে মেয়ে লেখা পড়া করছে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুধ বিক্রি করে কৃষি কাজের জন্য বেশ কিছু জমিও ক্রয় করতে পেরেছেন। যার ফলে সে ১২ মাস নিজের গোলার ধান দিয়ে সংসার পরিচালনা করেও কিছু হাটে বিক্রি করতে পারছে। ১ থেকে দেড় ঘন্টা তাদের দুধ বাজারে দুধ বিক্রি হয়। বাকি সময়টুকু নিজের কৃষি জমির পরিচর্যা কাজে থাকেন।
ইসলামপুর গ্রামের মৃত জমসেদ আলীর ছেলে জুনু মিয়া (৫৫) বলেন, তার ১৩টি গরু রয়েছে, তার মধ্যে ৮টি গাভী গরু। সে দুধ বিক্রি করে এখন প্রায়ই সাবলম্বি। দুধ বিক্রির পর বাকি সময়টুকু অন্যান্য কৃষি কাজে লাগিয়ে দেন।
সে আরো জানায়, গরু পালন করে আলোর মুখ দেখতে পেরেছে। কালীকৃষ্ণপুর গ্রামের মৃত মালেক মিয়ার ছেলে আলেক মিয়া (৪০) বলেন, তার ৭টি গাভী গরু রয়েছে।
এছাড়া গরু খামারিদের সাথে আলাপকালে আরো কয়েকজন খামারি উপস্থিত ছিলেন, তারা হলেন, কালীকৃষ্ণপুরের রউফ মিয়ার ছেলে রুস্তুম আলী (৪০), মৃত আলেখ মিয়ার ছেলে হামিদ মিয়া (৬০), ফাজেল মিয়া, মোহাম্মদ আলী, আখতার হোসেন ও জাকির হোসেন। তাদের সবার একই পেশা। তারা সবাই এখন স্বাবলম্বী। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তারা আরও বেশী পরিমাণে দুধ উৎপাদন করে দেশের পুষ্টির চাহিদা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে মনে করেন। এসব খামারিরা প্রতিদিন সকাল ৬টায় প্লাস্টিকের ট্রাম, ছোট-বড় মাঝারি বালতি, কলসি এবং টিনের ড্রামে করে দুধ বাজারে নিয়ে আসে।




