লিড নিউজ

সিলেটে একুশে বইমেলায় যেন বইপ্রেমীদের মিলনমেলা

কে এম সুহেল আহমদঃ 

“হাজার যুগের সূর্য তাপে,
জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচুড়ার ডাল যে।”
আধুনিব কবি আল মাহমুদের “শূণ্যতার প্রান্তরে “

নামের একুশে কবিতার এ চরণটির মাঝে সূূর্যের তাপে কৃষ্ণচুড়ার ডাল যেমন লাল হয়েছে তেমনি হজারো প্রাণের শহীদদের রক্তে লাল হয়েছে আমার সোনার বাংলাদেশ। সেই প্রতিদানে পাওয়া ভাষাটি যেমনই হোক, যে বর্ণেরই হোক জন্মের পর শুনে আসা মায়ের মুখের ভাষা সবারই প্রীয়। সেই ভাষার জন্য ৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীতে জীবন দিতে হয়েছিল সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বার সহ নাম না জানা বীর বাঙ্গালীরা। সেই দিনটি “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। সেই দিনকে উপলক্ষ করে সারা দেশে চলছে “অমর একুশে বইমেলা ২০১৭”।
তারই ধারাবাহিকতায় সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে বইমেলাটি শুরু হয়েছে ৭ ফেব্রুয়ারী( সোমবার) থেকে। চলবে ১৩ ফেব্রুয়ারী (সোমবার) পর্যন্ত।মেলার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।তবে একুশের চেতনা ও বসন্ত উৎসবের আমেজে কর্তৃপক্ষ মেলার শেষ দিনের সময়টি দুপুর ১২ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

boi mela
সিলেট নর্থ ইষ্ট ইউনিভার্সিটি’র সহযোগীতায় মেলার আয়োজন করেছে “প্রথম আলো বন্ধুসভা “।বিভিন্ন লেখকদের
দেশের ইতিহাস,ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মুক্তিযোদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস বিষয়ক বই সহ গল্প,কবিতা,ছড়া, উপন্যাস, সাহিত্য বিষয়ক বই এবং দেশি, বিদেশি ও আঞ্চলিক নবীন ও প্রবীণ লেখকদের বই স্থান পেয়েছে মেলাতে।শুধু তাই নয়, মেলায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ভিন্ন আঙ্গিকে বাংলা বর্ণমালা দিয়ে সাজানো হয়েছে।
সরজমিন মেলাতে গিয়ে দেখা যায়, একুশে বইমেলা যেন বইপ্রেমীদের মিলন মেলা। মেলায় আসা দর্শণার্থীরা জানালেন মাতৃভাষা ও বই সম্পর্ক নিয়ে নিজেদের অনুভূতির কথা।
বই মেলা একটি সামাজিক উৎসব, তাই উৎসবটি পালনের চাহিদা মানুষের জীবনে প্রয়োজন আছে বলে অনুভূতি প্রকাশ করলেন মেলা দেখতে আসা ষাটোর্ধ্ব বয়সের প্রবীণ ব্যাক্তিত্ব বালাগঞ্জের আং সত্তার চৌধুরী।মেলা উপভোগ করে তার খুবই ভালো লেগেছে বলে ও জানালেন তিনি।
মেলায় আনন্দ উল্লাসের পাশাপাশি ক্ষুধে পাঠকরাও অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন স্টলে ঘুরে পছন্দের বই কেনেন। তেমনি একজন ক্ষুধে পাঠক ব্লু বার্ড স্কুল এন্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র মোঃ ফুয়াদ হোসেন সে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ে জানার জন্য এমনি বই পড়তে আগ্রহী এবং হুমায়ুন আহমদের লেখা “হিমু” তার প্রীয় বই বলে জানায়।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নওশিন শারমীলি ও পাবলিক এন্ড মিনিস্ট্রেশন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী তানজিলা আফরীন তারা সিলেটে একুশে বইমেলা দেখতে এই প্রথম এসেছে। মেলা সম্পর্কে তাদের অভিমত জানতে গিয়ে তারা বলেন, বিভিন্ন ধরনের বই মেলায় থাকবে বলে ভাবছিলাম, এসে দেখি স্থানীয় আঞ্চলিক লেখকদের বই বেশি।তার পরে ও সিলেটের একুশে বইমেলাটি দেখার মত একটি উৎসব।এটি আমরা সকলে একুশে উৎসবের মাঝে খুজে পাই আমাদের অতীত রক্তঝরা ইতিহাস ও ঐতিহ্য।এমনকি এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মাঝে গড়ে উঠবে ঐক্যের সম্প্রীতি। তাই তারা আগামীতে মেলাটি বড় পরিসরে হওয়ার আশা রাখেন,যেখানে থাকবে সব লেখকদের বই।
এদিকে মেলায় আসা স্টল মালিকরাও বসে নেই, তারা মেলায় আসা বইপ্রেমীদের কাছে উৎসুক মনে বই বিক্রি করছেন তাদের চাহিদা মত তেমনি অনুভূতির কথা জানালেন “বাসিয়া প্রকাশনী ” স্টলের প্রকাশক মোহাম্মদ নওয়াব আলী।তিনি বলেন, প্রবাস জীবন বাস করে ও দেশের অনেক প্রতিভাবান লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের লেখা বই বের হয়েছে মেলায়।এমনি একজন লন্ডন প্রবাসী লেখক গোলাপগঞ্জের বুধবারীবাজার ইউপি’র বনগ্রামের কবি এ কে এম আব্দুল্লাহ’র কবিতার বই “মাটির মাচায় দন্ডিত প্রজাপতি”।
তিনি আরো বলেন, তার কবিতা পড়লে মনে হয়না তিনি বিদেশে আছেন।কবিতার পরতে পরতে শুধু দেশের চিত্রই ফুটে উঠেছে।
তিনি এ ধরনের লেখকদের কবিতা পড়ার প্রয়াস জানান পাঠকদের।
জসিম বুক হাউস স্টলের দায়িত্বে থাকা কাওসার আহমদ জানান, এবারের মেলায় সিলেটী লেখকদের বইয়ের পরিমান বেশি। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী, উপন্যাস, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক বই,সামাজিক ও মনস্থাত্ত্বিক বিষয়ক বই সহ জাফর ইকবাল, হুমায়ুন আহমদের লেখা এবং মরমী কবি প্রয়াত বাউল শাহ আব্দুল করিম রচনাসমগ্র বইয়ের প্রতি পাঠকদের চাহিদা দেখা যায়।
মেলার আয়োজক প্রথম আলো বন্ধুসভা’র সভাপতি মিজানুর রহমান ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দীন জানান, বিগত সময়ের তুলনায় এবারে বড় পরিসরে ৭ দিন ব্যাপি মেলার আয়োজন করা হয়েছে তাই মেলায় আগত দর্শণার্থীদের উপচে পড়া ভীড় লক্ষ্যণীয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সুষ্ঠভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তাই দর্শণার্থীরা সুন্দর পরিবেশে মেলাটি উপভোগ করছেন।আগামীতে সুপ্ত পরিসরে ভিন্ন আঙ্গিকে মেলার আয়োজন করা হবে এমনটি আশ্বাস জানালেন তারা।
মেলায় অংশগ্রহণকারী স্টলগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রথম আলো বন্ধুসভা, বাসিয়া প্রকাশনী, জসিম বুক হাউস, অন্বেষা প্রকাশনী, সিলেট বুক সেন্টার, শ্রীহট্ট প্রকাশ, চৈতন্য, ঘাস প্রকাশন, উৎস প্রকাশন,
বন্ধু হবে?, দাড়িকমা প্রকাশনী ও নাগরী স্টল। প্রতিদিনের আয়োজনে মেলায় রয়েছে আত্ম বিনোদনমূলক মনোজ্ঞ সাংস্কুতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে ছড়া,কবিতা আবৃত্তি,নৃত্য ও মনোমগ্ধকর গান পরিবেশন করছেন শহরের শীর্ষস্থানীয় শিল্পীরা।যে সব প্রতিষ্ঠান প্রতিদিনকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দর্শণার্থীদের মন মাতিয়েছে তারা হচ্ছে সিলেটের বিখ্যাত আবৃত্তি সঙগঠন “মুক্তাক্ষর”, লিডিং ইউনিভার্সিটি ইংরেজী বিভাগ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। মেলার শেষ দিনে প্রথম আলো বন্ধুসভা কর্তৃক প্রকাশিত “ভাইয়াপি” ম্যাগাজিনের মোড়ক উম্মোচন করা হবে।
তাছাড়া শেষ দিনে রয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একুশের চেতনায় আর বসন্ত উৎসবের আমেজের মনমাতানো মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
অমর একুশে বইমেলার পরিসর বাড়াতে সময়ের দাবী পূরণে আন্তর্জাতিক কাঠামোর রূপ নিতে আগামীতে বড় পরিসরে মেলা হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন মেলায় আশা দর্শণার্থীরা। এমনটাই অভিমত তাদের।

Related Articles

Back to top button