শিল্প ও সাহিত্য

এইচ বি রিতা’র দ্রোহের কবিতা

সাহিত্য ডেস্ক: নিউইয়র্কের লেখক এইচ বি রিতা’র একগুচ্ছ দ্রোহের কবিতা প্রকাশ করা হল।

‘‘নিচে তা পাঠকের জন্য তুলে ধরা ’’

কবিতা বিদ্রোহ ঘোষণা করে

এক বিভৎস প্রতিরোধ চলছে বহুদিন
যেদিকেই যাই লাথি এসে পড়ে বুকে
আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে বেনিতো মুসোলিনিরা
মাদুর পেতেছে সর্বত্র
ভয়ানক ক্ষুধায় শকুনের দল
অস্থিরতায় চেটে খাচ্ছে কলম-রং তুলির আঁচড়ে;
বাক স্বাধীনতা, অধিকার, চেতনা!
নারীর সম্ভ্রম খুবলে খেতে গিয়ে,
ভুল করে জননীর রসটুকু খেয়ে নেয়
বাক্য হরনে ওরা শক্ত চোয়াল চেপে
জিব টুকো ছিঁড়ে নিতে চায়
অনধিকার, জন্মান্তরের অধিকার যাদের
তারা বিশ্বের মাটিতে,
পুঁতে দিতে চায় নিজ সংবিধান, আদর্শ-মতাদর্শ।
বিকৃত শকুনের দল কলম স্বাধীনতা সংজ্ঞায়ীত করে
বিভ্রান্তি, অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলায়
মেধাবী মগজ খেয়ে যায় ক্যাম্প, বন্দীশালায়
ভয় দেখিয়েই জয়- এখন সাংবিধানিক আইন।
বাক স্বাধীনতা একটি মুক্ত সংবাদ-এলিয়ানর রোজভেল্ট
জানতেন কি তিনি,
বেনিতো মুসোলিনিদের সংবিধানে
বাক স্বাধীনতা বলে কোন শব্দ নেই?
স্বার্থরক্ষার দলীয় টয়লেট পেপার যারা,
ক্ষমতার আঘাতে তারা ই কবির কলমকে রক্তাক্ত করে
বীভৎস রক্ত চক্ষুর হিংস্র শকুনেরা ভুলে যায়,
কবি, কবিত্ব লুকিয়ে লাথি মারতে জানে শকুনের পাছায়
কেননা, কবিতা মানবিক স্বাধীনতায়
বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
(মার্চ ০২, ২০২১)

মুশতাক কোথায়

কোদাল, বেলচায় মানবতার বুক খুঁড়ে
মুশতাককে পুঁতে দিলে তুমি; ভীষণ আঁধারে
বাঁশ চাটাইয়ে ধাপাচাপা ইতিহাস
আর কত খেয়ে যাবে বাংলাদেশ তুমি
তথ্য নির্ভর স্বচ্ছ মগজ?
লাথি মেরে ভাঙেনি চোয়াল তোমার
খামচে ধরেনি বুক, অনাধিকারে
শুধু বলেছিল, দু’টো কথা
শব্দ-কলমে ধরেছিল আপাময় বুকের ব্যথা
পুঁতে দিলে তারে, বুক ফুলিয়ে
আহা! স্বাধীন বাংলাদেশ।
কাল কিশোরটাকেও পুঁতে দাও
কিংবা বল, পুঁতিনি
হারামজাদা হাঁপাতে হাঁপাতে পুঁতে গেছে
বলে দাও, রাষ্ট্রদ্রোহী ছিল সেও
লিখে নাও সংবিধানে,
‘কলম হাতে সকল হারামির ফাঁসি নিশ্চিত’
তারপর,
শুধু তুমি বেঁচে থাকো ফোল্ডিং সিলিন্ডার টুপিতে
একা।
অভিশাপ অভিশাপ অভিশাপ;
অভিশাপ তোমাকে।
(ফেব্রুয়ারি ২৮,২০২১)


ভাষা রিমিক্স

খালি পা, লাল-হলদে গুচ্ছ ফুল হাতে
সাদাকালো কাপড়ে অকৃত্রিম তুষার পাতে
বাঁশের বেষ্টনীতে লাইটিং, ক্যামেরা ঘেরা মিনার
সিঁড়ি না পেরোতেই ফোনটা বাজলো
ওহ! নো!
হেলো! কেমন আছো?
ওপাশ থেকে সুরেলা কণ্ঠে,
তোমাকে মিস করছি। কখন ফিরবে?
এই তো জান! শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষ হলেই ব্যাক করবো!
ওকে। দেরী করোনা।
ডোন্ট ওয়ারি মেরি জান!
একদম সময় মত বান্দা হাজির হবে।
ফোনটা পকেটে রাখতেই এলার্মটা বেজে উঠলো
‘গেট রেডি ফর নাইট ক্লাব।’
ফুলটা তো চড়িয়ে নেই ব্রো!
(ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২১)

আরও পড়ুন: বিজয়ের উল্লাসে চাপা পড়া বীরাঙ্গনার আর্তনাদ

বেগমগঞ্জের আমি


এই যে তোরা খুলে দিলি জলস্রোতের বাঁধ
অবশেষে,জন্ম-জন্মান্তরের সম্ভ্রমটুকু
খোলা চিঠির মত আঙ্গুল ছুঁয়ে পড়ে নিল বিশ্ব;
আদর্শলিপি
শিখে গেল নাদান শিশুটিও
যৌন কামনার স্তর; খাদটির সন্ধান
উন্মুক্ত বুকে, যেখানে চুমুক দিয়েছিলি তোরা শিশুকালে
বিশ্ব দেখে নিল আজ বুঁটামূল
দেখে গেল তারা সুরুঙ্গ পথটি কত সস্তা!
শুধু তুই, তোরা নস
আগামীর শিশুটিও জেনে গেল,
মাতৃ যোনী বলে বিশেষ কিছু নেই।
উলঙ্গ আমি দু’পায়ের ফাঁকে তোদের দেখে বিহবল নই
বুকের ভিতর কবর খুঁড়ে আমি কাঁদি;
তোদের জন্মদাত্রীর বুক ফাঁটা ক্রন্দনে।
(অক্টোবর ১১,২০২০)

বিজয়শিশু

বৈরী হাওয়ায় স্বৈরী বিস্ফোরণ
টুঁটি চেপে স্বচ্ছ বরফ জলে পুতে দিয়েছিল সেদিন;
লৌহদন্ড
এক ফোটা জৈবিক তরল বিষাক্ত শুক্রাণূতে;
কোন এর নারীর ডিম্ব নিষিক্ত করে,
স্বাগতম জানিয়েছিল অনাকাঙ্খিত আমার।
একাত্তর নয়, বাহাত্তর দেখুন
দুই লক্ষ ধর্ষিতা গর্ভবতী নারী মহা বিপদে,
সমাজ-রাষ্ট্রের চক্ষুশূল
পরিবার লাথি মারে,
নারীর যোনী তখনো বিষে টনটন করে
অতপর, স্বাগতমে অস্ট্রেলিয়ান জিওফ্রে ডেভিস
গনহত্যা আবারো;
গর্ভপাত আইন নাড় কেটে দিল একলক্ষ সত্তর হাজার।
দেখুন বাহাত্তর,
দত্তক আইনী হুংকারে নারীর বুক ফুটো করে
কেমন করে কেড়ে নিয়েছিল দুধের শিশুটি
তুলে দিয়েছিল বিমানে, মাদার তেরেসার কোলে
বেঁচে গেল কেউ; বেঁচে গিয়েছিলাম আমিও
সেদিন আমার নাম ছিল; শত্রুশিশু, জারজ সন্তান।
প্রেক্ষপট তখনো সচল, ঝরে গেল কিছু প্রাণ
অস্তিত্ব, সম্ভ্রম হারানো সাহসী যুদ্ধা নারীর ঝাঁক
জন্ম দিল অলিখিত শতক হাজার যুদ্ধশিশুর
নাড়ি ছেঁড়া ধনটিকে দেখালো পৃথিবীর মুখ।
হে স্বাধীন বাংলাদেশ!
আজ আমরা কোথায়? আজ তাঁরা কোথায়?
আমরা কেন আজ পলাতক?
লোক লজ্জ্বা-ভয় ঘৃণা
সমাজ, রাষ্ট্র সভ্যতার ব্যার্থতায় আমরা কেন প্রশ্নবিদ্ধ?
আমাদের অভিশপ্ত জন্ম-দাগ মুছে ফেলতে,
বাংলাদেশ! আপনি ব্যার্থ।
লোকে বলে শত্রুশিশু, কখনো জারজ
বুদ্ধিজীবি-সুশীল সমাজ বলে যুদ্ধশিশু
মূলত,
আমরা যুদ্ধশিশু নই। আমরা বিজয়শিশু।
আমাদের জন্মে জন্মেছে বাংলাদেশ
গর্ভপাতে একদিন আপনিই মেতেছিলেন গনহত্যায়
অথচ,
আজো আমরা বাংলার বুকে;
বিজয়ের গান গাইতে চাই।
(ডিসেম্বর ১৪,২০২০)

জ্যাক দ্য রিপার
–
তলপেট থেকে নীচে পুরোটা, জরায়ুসমেত হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে
পাঁচটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জ্যাক দ্যা রিপার;
আজো এক রহস্যময় সিরিয়াল কিলারের নাম।
রিপারোলজি ঢের হয়েছে
স্যাডিস্ট নাকী পণ্ডিত, মীমাংসা হয়নি তার
স্টোনম্যান, দ্য জোডিয়াক কিলার
গবেষণা বিস্তর, মীমাংসা; অমীমাংসিত।
সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী
এক একজন দৃশ্যমান সিরিয়াল কিলার
পর্দার অন্তরালে অস্ত্র হিসাবে বেছে নিয়েছে মাদকদ্রব্য
কৌশল কিংবা কটাক্ষ
সবারই নিজস্ব ধরন আছে, লক্ষ্য কেবল একটাই;
নৃশংস হত্যাকাণ্ড।
ডানপিঠে টগবগে যুবক
ঘুমিয়ে পরে ছাইপাশ শরীরে নিয়ে
রাষ্ট্র তার মুনাফা লাভে ব্যস্ত;
কে দেখে এখানেও জ্যাক দ্যা রিপার,
আড়ালে হত্যা করে ছিঁড়ে নিয়ে যায় জননীর;
নাড়ি ছেঁড়া ধন।
জঙ্গি নিধনে নিরাপত্তা বাহিনী
স্বেচ্ছায় মানুষ মরে একক-শতক
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বৈষম্য
রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত
সরকারের কঠোর নিপীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন শেষে
হত্যা হয় জঙ্গি জনগোষ্ঠী, নিরপরাধ কত
কৌশলে অন্তরালে উদীয়মান হত্যাকারী
এখানেও জ্যাক দ্যা রিপার;
ছিঁড়ে নিয়ে যায় মানবতা।
ঘরে, বাহিরে
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র
সামাজিক অবস্থান, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ
সমাজ ছুঁড়ে দেয় কটাক্ষ
আশ্রয়হীন জনগোষ্ঠী দিকবিদিক শূন্য
জ্যাক দ্যা রিপার, আত্মহত্যার নীল কার্পেট বিছিয়ে ডাকে
তোরা আয়; তোরা আয়
রিপারোলজি অক্ষম এখানে
দায়মুক্ত পৃথিবী ছুঁড়ে দেয় শীতল বাতাস
বলে,
ভুলে যা! তোরা ঘুমিয়ে পড়।
জ্যাক দ্যা রিপার
ঘুমায়না
অদৃশ্য কালো এপ্রোনে হত্যা করেই চলে।
(জুলাই ১, ২০১৭)

অসুখী শহর

শহরটির আজ অসুখ করেছে
সংক্রমিত ‘কিছু একটা’
স্বৈরী বাতাস, দীপ্তিময় ভোর
অস্তমিত বিকালে ধোঁয়া উঠা চায়ের কাপে
হু হু করে উড়ছে ‘কিছু একটা!’
বিশেষায়িত দৃষ্টিতে বিষক্রীয়া তড়িৎ ঢুকে যাচ্ছে,
আইন্সটাইন মৃত মগজে।
এ অসুখ ফুসফুস প্রদাহ নয়,
চিন্তা, বুদ্ধি, উদ্ভাবনীশক্তি, সেরেব্রামের সবটুকু খায়
এ অসুখ আমার-তোমার বোধটুকু খায়।
এ শহর আজ রাবণের বেশে;
স্বচ্ছ নিঁপুন চোখগুলো খায়।
এ শহরে আজ আকাশ নেই
সন্ধার বাতাসে উড়ে যাওয়া শালিক নেই
পোশাকহীন শহরের গায়ে, শ্লীলতার সংজ্ঞা নেই
এখানে উঠোন জুড়ে কুয়াশার আড়ালে কেবল,
জহুরী চাঁপা অযত্নে গোঙ্গায়।
এ শহরে আজ কিছু নেই।
(মার্চ ১৮, ২০২১)

‘‘লেখিকার আরও কবিতা পড়তে  নিচের লিংকে ক্লিক করুন’’

(এইচ বি রিতা, নিউইয়র্ক

লেখক, সাংবাদিক, কলামিষ্ট, কবি, শিক্ষক)

Related Articles

Back to top button