শিল্প ও সাহিত্য

আসাদুজ্জামান শাওন এর একগুচ্ছ কবিতা

ভ্রমন
……..
অদ্ভুত ধূসর দিনগুলোকে মনে পড়ে
যখন ডিপ্রেশন আর নিকষ কালো অন্ধকার,আচ্ছন্ন করে রাখতো – অস্তিত্ব,
হয়তবা,সেই সময়টা ছিলো – জীবনের শ্রেষ্ঠ বা অ-শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত;
ক্রমশও কবিত্ব প্রতিভা নিয়ে বেড়ে উঠছিলাম;মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবো ভেবে।
স্মৃতি,ভালোবাসা,ব্যর্থতা,অনুশো
চনা,অন্ধকার জীবন,ক্রোধ,উগ্র কামনা-বাসনা এবং ব্যভিচারী মনোভাব –
আর,এসব সবকিছু যা লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলাম বা এখনো অবধি রাখছি কবিতায়।
গভীর রাতে সমস্ত ব্যথা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম – ছাদের বুকে
আঙ্গুলের ফাঁকে মৃত হতো অজস্র সিগারেট;মারিজুয়ানার ধোঁয়া ভেসে যেতো মহাশূন্যে,
গানস্ এন্ড রোজেস্ এর ‘নভেম্বর রেইন’ সং – এর সুর আবৃত করে রাখতো চারপাশ
কোরাসে লিপ্ত হতো অসংখ্য রাত পোকাদের বীভৎস শব্দ।
নিশ্চুপ প্রার্থনায়,ভেজা চোখে, শরণাপন্ন হতাম প্রভুর – এখনো হচ্ছি,
অবচেতন মনে প্রভুকে বলতাম – “আকাশ হতে আলো এনে দিন!”
নের্শাত চোখে বারংবার মহামান্য প্রভুকে খুঁজে বেড়াতাম –
হায়!অথচ,রক্তিম চোখ প্রতিক্ষণেই ধোঁকা দিতো, অভিশপ্ত শয়তানের মতন।
শীতল দৃষ্টিপাত মিলিয়ে যেতো প্রথম আকাশের বায়ুমন্ডলে
যে দৃষ্টি স্পর্শ করতে পারেনি প্রথম আকাশের ছাদ;
অথচ,পূর্ব-পশ্চিমের অধিপতি তিঁনি ছিলেন সপ্ত আকাশে।
মহামান্য প্রভু,
পৃথিবীকে আমার নরক মনে হয় –
পরকালে কবিত্ব প্রতিভা নিয়ে আপনার সামনে দাঁড়াবো,
যথোপযুক্ত পাপ-পুন্যের হিসেব নিয়ে, যেন আপনি তিরস্কার না করেন।
বস্তুত,আমি কি পাপী ছিলাম?
চেয়ে নিবো সত্তর জন হুর, যাদের স্তনের বর্ণনা পড়েছিলাম –
একজন মদ্যপ কবির কবিতায়;যদিও তিনি ছিলেন একজন নাস্তিক!
আরো চেয়ে নিবো বিশ্বস্ত মারিজুয়ানা,স্বর্গীয় মদ,স্বর্গের এক খন্ড জমি – নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল।
—————-

দৃশ্যপট
…………….
মহান দার্শনিক চিন্তাগুলো বিছিন্ন করেছিলো আমাকে ক্ষুদ্র ব-দ্বীপের মতন
আপেল পাতার কোমল ছায়ায় বসে –
অবাক বিস্ময়ে দেখছিলাম প্রকৃতির অদ্ভুত রহস্য সেই সাথে জাগতিক পরিবর্তন।
রাতের আকস্মিক মৃত্যু অতঃপর ভোরের অনুপ্রবেশ
ভোরের উদীয়মান সূর্য তখনও মধ্যাহ্ন অবধি পৌঁছায়নি,
দিনটি ছিলো মে মাসের চমৎকার রৌদ্রময় সকাল;
ছিলো স্বর্গ চক্ষুসম সূর্যের তপ্ত কিরণ।
আর, এসব দেখছিলাম দূর হতে; দেখছিলাম –
ডেইজি ও বার্লির সারি সারি শস্যক্ষেত,রোদের শাসন, নিকটবর্তী রোদ-ছায়ার আদিম প্রণয়,
শান্ত ছবির মতন সাজানো গ্রাম,গ্রাম্য জীবন – দূরের গু’টি কয়েক ঘর-বাড়ি হাওয়ায় দুলছে।
পাইনের বনে মৃদু মন্দ বাতাসের নিরর্থক আন্দোলন
ফসলের মাঠ – জমিনের পৌরাণিক শরীরে বিক্ষিপ্ত রোদ,
কৃষক-কৃষাণীগণ – ওদের শরীরে রোদের তৈলচিত্র,
সোনালী মাঠের বুক চিড়ে ফসল ভর্তি ঘোড়ার গাড়ি
একটি, তিনটি,পাঁচটি এভাবে নয়টি –
শস্যভর্তি ঘোড়ার গাড়িগুলো ছুটে যাচ্ছিলো অনন্তকালের পথে।
পশ্চিমা বায়ু ধীর লয়ে বয়ে যাচ্ছিলো – মহিমাণ্বিত পবিত্র নদীর মতন;
নদীর পাড়ে অসংখ্য ছোট ছোট ঝোপঝাড় – পানকৌড়ির বিস্ময়কর লুকোচুড়ি!
তীরে অদৃশ্য হাওয়ায় নৃত্যরত সোনালী ড্যাফোডিল,যাদেরকে একদৃষ্টিপাতে দেখেছিলাম বিশ হাজারের মতন – হয়ত কম বা আরও অধিক;
দূরের নদী, পালতোলা নৌকা, মাঝির ভাঙ্গা কন্ঠে জন লেলন – এর “গ্যিভ পীস্ এ্যা চান্স” সং।
মৎস শিকাররত মাছরাঙা দম্পতি – দিন শেষে ও’রা চুমো খাচ্ছিলো ঠোঁটে-ঠোঁটে!
বালুচর ধরে হেঁটে যাচ্ছিলো একদল লাল কাঁকড়া – বিশেষ অভ্যর্থনায় অপেক্ষারত ঢেউ।
ঝিম ধরা আলোয় – আর,এসব দেখছিলাম, দূর হতে –
দূরাগত পপি ফুলের গন্ধে তন্দ্রাছন্ন প্রায় অলস মস্তিষ্ক ; দৃঢ় অপেক্ষায় সন্ধ্যার ও প্রার্থনার।
মাথার উপর দিয়ে উত্তর-পশ্চিমে উড়ে যাচ্ছিলো গাঙচিল
বকের সারি,এমনকি একঝাঁক চড়ুইপাখি – তাদের বিমোহিত কিচির-মিচির শব্দ।
ঘন জঙ্গল হতে ভেসে আসছিলো হলুদ বক্ষধারী পাখির মাতাল সংগীত – সপ্তমী সুর, ঝিঝি পোকার ডাক।
যদি ভিনসেন্ট উইলিয়ামস ভ্যান গখ বেঁচে থাকতেন!
তবে অনুরোধ করা যেত – বিনীত অনুরোধ দৃশ্যপটগুলোর একটি পোট্রেইটের জন্য –
যেন আমার মৃত্যুর পর – ভবিষৎ প্রজন্ম – এমনকি তাদের ভবিষৎ প্রজন্ম,
ভালোবাসতে পারে প্রকৃতিকে,উদঘাটন করতে পারে অপার সৌন্দর্য ;
ও’রা সবাই যেন বুঝতে পারে প্রজ্ঞাময় প্রভুর অনুগ্রহ!
অথচ,তিনি গত হলেন আমার জন্মের একশত উনত্রিশ বছর পূর্বে,
মানুষের জীবন ড্যাফোডিলের মতন স্বল্প আয়ুষ্কাল – বসন্তের মতন সংক্ষিপ্ত।

——————

দেহত্যাগ
——
একদিন তোমার
চুলের ঘ্রাণ নিয়ে –
এ পৃথিবী বিদায় জানাবো।
তোমার পবিত্র বাহুতে যাবো চিরদিনের জন্য নিদ্রা;
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মৃত্যু!
অশ্রুতে আঁকা তোমার মায়াবী আঁখিদ্বয়
গহীনে অদৃশ্য শীতল নীলাভ সমুদ্র;
ও সমুদ্রটা কেবল আমি দেখতে পাই –
ঠিক চোখের গভীর অন্ধকারে তোমার।
দু’চোখ বেয়ে নেমে আসা তোমার কান্না,
দুর্লভ জলপ্রপাত।
শেষ স্পর্শ তোমার
অতঃপর মৃত্যু;এ মৃত্যু অমৃততুল্য।

———

একটি কবিতা ও তিনটি কালো গোলাপ
…….
কফিনের ভিতর
একটি কবিতা – অক্ষরগুলো অতি প্রাচীন
তিনটি কালো গোলাপ,
পীথাগোরাস বলেছিলেন – “তিন সংখ্যা শুভ।”
স্যারের সাথে দেখা হয়েছিলো এক সন্ধ্যায়
শহরের কোন এক অন্ধকার পানশালাতে – মদ্যপান।
ও’টাই ছিলো তার সাথে আমার শেষ আলাপন –
মধ্যরাত ঘুমিয়ে পড়েছিলো আমাদের স্বচ্ছ গ্লাসের জলে,
তিনিই বলেছিলেন – শুভ সংখ্যা তিন এর কথা;প্রথম শুনেছিলাম।
প্রভু! পৃথিবীর সমস্ত আঁধার নিয়ে –
নরক ভ্রমণে যাচ্ছি
কবিতা এবং তিনটি কালো গোলাপ রেখে যাচ্ছি;
প্রিয়তমার জন্য,যিনি ছিলেন আমার প্রেমিকা – তার জন্য।
স্বর্গ প্রেমিকদের জন্য নয় –
প্রেমিকাদের জন্য।

———————-‘

ধূসর স্মৃতি’

……..

ক্রমশও শীতল হৃদয় হতে বের হয়ে যাচ্ছিলাম
সূক্ষ্মভাবে –
পথ ছিলো বিচ্ছিন্ন; ক্লান্তিহীন পথভ্রমণ,
উদ্দেশ্যহীন এবং পথভ্রষ্ট।
আমরা কেউ কি ব্যথিত হয়েছিলাম সেসময়?
নিমজ্জিত হয়েছিলাম, স্মৃতিতে?
যদিও তখনও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলাম,
বিদায় বলিনি।
পবিত্র ষ্টাইক্স নদী – এর কালো জলে যখন ভেসে যাচ্ছিলো আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন – মৃত্যুপরী টারটারুসে, আমরা কি ভয় পেয়েছিলাম?
মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়
কিন্তু পথ? দীর্ঘপথ – শেষ হয় না!
তুমি আমাকে বলতে পারো কাপুরুষ অথবা আরো অনেক কিছু
যেহেতু,আমি ছিলাম চির অতৃপ্ত।
ছিলাম,ওডিসিয়াসের মতন হতভাগ্য;
হায়, ওডিসিয়াস আপনার জন্য আমার দুঃখ হয় –
সমুদ্রাধিপতি পোসাইনডনের অভিশাপ নিয়ে
আপনি যখন সমুদ্রে ভেসেছিলেন দশটি বছর;
পোনিলোপী;যে নারী কেঁদেছিলো দীর্ঘ বিশটি বছর – বিরহে, বিষণ্নতায় আর আশঙ্কায় – আপনার জন্য ওডিসিয়াস।
উদ্ভট চিন্তাগুলো আমাকে প্রায়শ নিমগ্ন রাখে
যাদের নিয়ে গবেষণায় লিপ্ত ছিলাম দীর্ঘদিন;
আকস্মিক প্রশ্নগুলো বিমোহিত করত –
বলো, বিচ্ছিন্ন ছিলাম কি আমরা পরস্পর থেকে?
অথচ,আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো এক এবং অভিন্ন
পবিত্র প্রেম,দূর হতে দৃষ্টি বিনিময়, অদৃশ্য অনুভব।

Related Articles

Back to top button