
মোঃ ইসলাম উদ্দিন:পর্ব ২
কেইস টেবিলের আনুষ্ঠানিকতা শেষকরে আবার চলে আসলাম আমদানি কক্ষে। টাকার বিনিময়ে একটু পানির ব্যাবস্তা হওয়ায় কোনমতে হাতমুখ দুয়ে কিছুটা রিফ্রেশমেন্ট এর সুযোগ পাওয়া গেলো। এরই মধ্যে আবার দুপুরের ফাইলের ঘন্টা বেজে ওঠায় শুরুহল ফাইল।ফাইল শেষে সবার জন্যে আলুর ঝুল দিয়ে শুটকি আর ভাত পরিবেশন করা হলো। সাথে আছে ডাইল। প্রচন্ড খিদের মধ্যে এই খাবারটা দিয়ে নিজেকে বাচানোর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালাতে শুরুকরি। খাবারই যদি না খাই তাহলে হয়তো জীবনটাই থাকবেনা। এরই মধ্যে ১৬ নং ওয়ার্ডের রাইটার এসে আমার নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন। আমার পাশের অন্য আসামীরা বলতে থাকলেন ১৬ নং ওয়ার্ড হচ্চে পানিশমেন্ট ওয়ার্ড। ওখানে আপনার অনেক কষ্ট হবে। যত ধরনের বড় অপরাধী আছে সভাইকে সেখানে পাঠানো হয়। অন্য যেকোনো ওয়ার্ড এর আসামীরা শুধু ফাইলের সময় হাজিরা দিয়ে সারাদিন ওয়ার্ডের বাইরে অবস্তান করতে পারে। কিন্তু ১৬ নং ওয়ার্ডের আসামীরা সারাদিনই ওয়ার্ডের ভিতরে অবস্তান করতে হয়।শুধু গোসল ও ইন্টার রুমে সাক্ষাতের সময় ব্যাতিত সারাদিনই ভিতরে অবস্তান করেন এই ওয়ার্ডের আসামিরা। কঠিনের মধ্যে আরও কঠিন! বুজতে পারছিলাম কি করবো। কিন্তু নিজেরতো আর কিছু করার নেই।কিছুটা চিন্তার রাজ্যে বিরাজ করছিলাম এমতাবস্থায় ওয়ার্ড রাইটার আলফু মিয়ার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম। উনি বললেন, চলেন আমার সাথে। উনাকে অনুসরণ করে পিছু হাটতে লাগলাম। আমার পিছনে আরও তিনচারজন লোক। ৩-৪ মিনিট হাটার পর আমরা গিয়ে উপনিত হলাম গোডাউন এর সামনে। সেখানে উপস্তিত সভাইকে থালাবাসন ও কম্বল হাতে তুলে দেওয়া হয়। এগুলি নিয়ে গন্তব্য ১৬ নং ওয়ার্ডের দিকে যাত্রা শুরুকরি। পথিমধ্যে কয়েকজন রাজবন্দীর সাথে দেখা হলো। উনারা আমার জানতে চাইলেন। খুব বেশী কথা বলার সুজুগ হয়নি কারণ আমি পানিশমেন্ট ওয়ার্ডের অধিবাসী হতে যাচ্ছি তাই ওয়ার্ড রাইটার আমাকে কারো সাথে কথা বলতে নিষেধ করেন। আরেকটু আগ্রসর হয়ে দেখলাম গাছের সাথে একলোক বাধা আছে। পরবর্তীতে জানতে পারি এটা একটা পানিশমেন্ট সিস্টেম যাকে বলে গাছ ফিটিং। আমাদের নির্ধারিত থাকার যায়গায় যাওয়ার পর বিছানাপত্র ঠিকঠাক করতে হবে। কিন্তু কিভাবে কি করবো বুজতে পারছিলাম না। ১৬” যায়গায় এত্তবড় কম্বল বালিশ আর বিছানাচাদর বিছাতে পারছিলামনা। এমন সময় সাহায্যরূপ উদারতার পরিচয় দিয়ে এগিয়ে আসলেন এক ভাই বিয়ানিবাজার নিবাসী আবুহানিফ।যিনি আমাকে তার সিটপার্টনার হওয়ার অফার করলেন। সিটপার্টনার মানে হচ্চে দুইজনের সিট একসাথে করে শেয়ার ভিত্তিতে ব্যাবহার করা। এতে করে কিছুটা হলেও ঘুমানোর সুজুগ পাওয়া যায়। সিটপার্টানার অনেক কষ্টকরে আমাদের সিট রেডি করলেন।মাত্র সপ্তাহ খানেকের পরেই তিনি অন্য ওয়ার্ডে স্তানান্তর হওয়ায় আমার কষ্টের পরিমানটা আরও বৃদ্ধিপায়। শারিরিক কষ্টের চাইতে মানষিক যন্ত্রণাটা ছিলো অনেক বেশী। একা একাই সময়গুলিকে কাঠাচ্ছিলাম। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরেই গোসল। নাস্তার জন্যে বড় মাপের আঠার রুটি। এটি খাওয়ার জন্যে অনেক কারুকাজ করতে হত।প্রথমে ভালোভাবে ঝেরে নিয়ে হালকা পরিমাণে গুড় মিশিয়ে খাওয়া। ইন্টার রুমে সাক্ষাতকার ও পত্রিকা পড়া। দুপুরের ফাইল ও খাবার। কিছু সময় বিশ্রাম। যাতে করে রাতেবেলা ঘুম না হলেও চলে। কারণ রাতে সভাই ঘুমানুর চেস্টা করে। এতেকরে পাশেরজনের শরিরের সাথে রারবার শরির লাগে।দিনের বেলা লোকজন গল্পগোজব আর আড্ডায় ব্যাস্ত থাকেবলে ইলিশফাইলের মত অবস্তা অনেকসময় হয়না। এরই মাঝে একজনের কাছে কিছু বই পাওয়া গেল। বইগুলি পরে কষ্টের সময়েও কিছুটা ভালো যাচ্ছিল। যার মধ্যে কয়েকজন মনিষীর জীবনীগ্রন্ত ছিল।ভালো লেগেছিল সেখানে পাওয়া বিপ্লবী চে-গুয়েভারার জীবনের সংগ্রামী অধ্যায়গুলি পড়ে। এমনি রুটিনের মধ্যেই একদিন কোর্টে যাওয়ার পালা। সেখানে আমার ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করলেন পুলিশ কর্মকর্তা। রিমান্ড নামক শব্দটি শুনলেই মানুষ যেমন আৎকে ওঠে আমিও তার ব্যাতিক্রম নই। কারণ এই শব্দটি শুনার সাথে সাথেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে থানা কাস্টরির চোট্ট কক্ষটি, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে মানুষনামের মস্তবড় এক দানবের ছবি। যার হাতে রয়েছে ইয়ামোটা এক ডান্ডা। প্রতিটি সত্যপন্তি মানুষ যেন এই জাতীয় রিমান্ড থেকে রেহাই পায় সেই কামনা করি। আবার শারিরির অসুস্থতা।তার সাথে মানষিক যন্ত্রনা। পানিশমেন্ট ওয়ার্ডে ফিরে আসার পর প্রিয়জন হিসেবে পাওয়া আবু হানিফকে আর কাছে পাচ্ছিলাম না। আশপাশের সিটের মানুষগুলির ব্যাবহার এবং তাদের আচার আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে এই ওয়ার্ড পরিত্যাগ করে নিউজেল ১ কিংবা ২ এ কিভাবে যাওয়া যায় সেই প্রচেষ্টা চালাতে শুরুকরি। আমি চাচ্ছিলাম ওয়ার্ড পরিবর্তন। কিন্তু আমার মহান রব চাইলেন কারাজীবন থেকে উত্তরণ।সপ্তাহ খানেকও যায়নি প্রিয়ভাজন রেজাউল করিম দেখা করতে গিয়ে সংবাদ দিলেন জামিনের। কারাগারের অধিবাসীর জন্যে মনেহয় এর চেয়ে ভালো আর কোন খবরই হতেপারেনা। এটা কেউই অনুভব করতে পারবেনা যদিনা সে জেলে যায়। এইদিন জামিন হলেও বাহির হতে পারিনি কারণ ভেইলের কাগজটি যথাসময়ে কারাগার অফিসে আসেনি। অপেক্ষার পালা পরদিন সকালবেলার। সময় যেনো যাচ্ছিলনা। অনেক প্রতিক্ষার পর দশটার দিকে কলিংরাইটার এসে আমার নাম ডাকলেন। নিয়ে গেলেন সহকারী জেলারের অফিস কক্ষের সামনে। সেখানে আরও কিছু লোক অপেক্ষমান যাদের জামিন হয়েছে। অফিসিয়াল নিয়মগুলি সম্পন্ন করে আলোকিত ভুবনের মুক্তপাখির স্বাদ অনুভবের পালা। এক এক করে জামিন প্রাপ্তরা বাহির হচ্চেন। আমার সময়টি আসলে বের হয়েই কারাগারের প্রধান ফঠকের সামনে অপেক্ষমাণ সহকর্মী প্রিয়জনদের দেখতে পেলাম। সবার ভালোবাসাযুক্ত লালগোলাপের উষ্ণ অভ্যর্থনা লালঘরের সকল গ্লানি আর ক্লান্তিকে নিমিষেই যেনো ফিনিশ করে দিলো।
লেখকঃসাংবাদিক।




