লিড নিউজ

শিখার মৃত্যুঃ দায়ী কে?

এইচ বি রিতা:

জানুয়ারী ২৮, ২০১৮,
শহীদ সেহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মা ও শিশু বিভাগের ১০ নং ওয়ার্ডে পরিত্যাক্ত লাশটি পড়ে আছে। পাশে সদ্য ভূমিষ্ট নবজাতক মাতৃদুগ্ধ বন্চিত চিৎকারে জানান দিচ্ছে ‘পৃথিবী নির্দয় জেনেছি; তারও আগে জেনেছি মানুষ আকারে পশু দিব্যি খুঁজে নেয় আহার।’

২৩ বছর বয়সী মেয়েটির নাম শিখা। স্বামীর নাম আবুল হোসেন, মিরপুর পীরেরবাগের স্থায়ী বাসিন্দা তিনি।
দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দিতে ভর্তি হোন তিনি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মা ও শিশু বিভাগে। ২৭শে জানুয়ারী সিজারের মাধ্যমে সুস্থ্যভাবেই জন্ম দেন একটি পুত্র সন্তানের।

শিখার ছেলে

ঘটনা ঘটে পরের দিন ২৮শে জানুয়ারী সকাল। রোগীর গায়ে জরুরী ভিত্তিতে রক্ত দিতে হবে বলে ভারপ্রাপ্ত ডাক্তাররা হঠাৎ করেই রোগীর শরীরে রক্ত পুশ করেন। সাথে সাথে সে রক্ত জমে উঠে শিখার চোখে। ব্যাস! ধরফরিয়ে সে মুহূর্তেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন শিখা।

ঘটনার অন্তরালে ঘটনা কি ছিল, তা জানার কসরত করেননি তার ভীতু স্বামী আবুল হোসেন কিংবা শশুড়ালয়। ডাক্তারদের হুমকিতে দৌড়ে লাশ নিয়ে রওনা হোন তারা মাটিচাপা দিতে। শিখার পিতা লুৎফর রহমান সরু আমগাও নারায়নগন্জের বাসিন্দা। তিনিও নীরবে কন্যার লাশ নিয়ে বিদেয় হোন।
শিখাকে শেষ গোসল দিতে গিয়ে তার পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লাশের গায়ে বামপাশে কিডনীর দিকে কাটা সেলাই দেখতে পান তারা। সেটা আসলে কি ছিল, তাও স্পষ্ট নয়।
ঘটনার দিন আমি বহুবার বহুভাবে শিখার আত্বীয় ও স্বামীর সাথে কথা বলার চেষ্টা করি। তাদেরকে পুলিশ কেইস করার কথা বলি। মৃতের স্বামী আমাকে জানান,
“আমার আব্বা ও শশুর দুইজনেই মানা করছে পুলিশ কেইস করতে। টাকা পয়সার মামলা, আমরা তাদের সাথে পেরে উঠবনা। তাছাড়া, যে যাওয়ার সে গেছে, এখন পোস্ট মর্টেমের নামে তার গায়ে কাঁটাছেড়া করে আত্মাকে কষ্ট দিয়ে কি লাভ।”
ভদ্রলোকের সাথে কথা চলাকালীন, তার কন্ঠে কোন জড়তা বা স্ত্রীবিয়োগ শোক লক্ষ্য করিনি।
ঘটনার অন্তরালে ঘটনা কি ছিল তা একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়েই রয়ে গেল। অজ্ঞাতই রয়ে গেল সেদিন আসলে কি ঘটেছিল! শশুড়ালয় খরচ বাঁচাতে কম টাকায় কোথা থেকে দূষিত রক্ত কিনে এনেছিল শিখার জন্য? নাকি কর্তব্যরত ডাক্তারদের গাফিলতিতে শিখা সেদিন রক্তচক্ষু নিয়ে মরে গিয়েছিল, তা আমরা জানিনা। আমরা জানিনা তার কিডনী সাইডে কাটা সেলাই মূলত কেন ছিল? জানার কোন চেষ্টাও করেনি তার স্বামী ও পিতা।

শিখাকে রক্ত দিতে ডাক্তারদের পরামর্শ উপেক্ষা করে শিখার শাশুড়ী তার ছোট ছেলে খলিলকে দিয়ে বাহির থেকে ২ হাজার টাকার রক্ত কিনায় বলে শিখার আত্বীয় ও তার পরিবারজন দাবী করেন। কিন্তু একই হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত ক্রয় করেছেন বলে দাবী করেন শিখার স্বামীপক্ষ।

আমরা জানি যে, কারো শরীরে রক্ত দেয়ার ক্ষেত্রে গ্রহীতার রক্তের সঙ্গে দাতার রক্তের গ্রুপের অবশ্যয়ই মিল থাকতে হবে। কোনও রোগীকে রক্ত দেওয়ার আগে দাতা এবং গ্রহীতার রক্তের কম্পোসিটের মিল হওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং গ্রুপ মেলার পরেও গ্রহীতার শরীরের রক্ত যে ধরনের কম্পোসিট চায়, তার সঙ্গে দাতার রক্তের কম্পোসিটের মিল আছে কি না তাও লক্ষ্য রাখতে হবে। শিখার শরীরে রক্তদানের আগে ডাক্তাররা কি এই বিষয়টি খতিয়ে দেখেছিলেন?
আরো একটি বিষয় হল, কোনও ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে রক্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রক্তের নম্বর খেয়াল রাখতে হয় অর্থাত্‍ কবে সেই রক্তটি নেওয়া হয়েছিল সে বিষয়টি খুঁটিয়ে দেখা একান্ত জরুরী। পাশাপাশি, ব্লাড ব্যাঙ্কের ওই রক্তের মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ অবশ্যই খেয়াল করা জরুরি৷ কারণ একটি নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর সেই রক্ত শরীরে নিলে রোগীর শরীরে নেগেটিভ প্রভাব পড়বে৷ শিখার দেবর রক্ত সংগ্রহের সময় কি
রক্তের কম্পোনেন্ট ফর্ম ভাল করে দেখে নিয়ে তবে রক্ত কিনেছিলেন?
এক জায়গা থেকে অন্যত্র রক্ত নিয়ে যাওয়ার সময় একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখতে হয়৷ সাধারণ ২০-৬০ তাপমাত্রায় রক্ত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিতে হয়। শিখার দেবর কি সে বিষয়ে অবগত ছিলেন? কিংবা কর্তব্যরত ডাক্তাররা কি তাকে সে বিষয়ে অবগত করেছিলেন?

এমনি বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়ে অকালেই ঝড়ে গেল একটি প্রাণ। শিখা চলে গেল না ফেরার দেশে। কিন্তু থেমে থাকেনি কারো জীবন। স্বামী, শশুড়ালয়, পিতা- কেউ নিশ্চল হয়ে যায়নি। জননী ব্যতীত পিতৃগৃহ ও স্বামীগৃহে সব স্বাভাবিকভাবেই চলছে।
এমন হ্নদয়বিদারক একটি মৃত্যু নিয়ে তার স্বামী ও পিতার নীরবতা কি প্রমান করে? তাদের অসহায়ত্ব? নাকি দায়ীত্ব ও দ্বায়হীনতা? স্বামী হয়তো আবারো নতুন করে ঘর বাঁধবেন, সুখী হবেন, কিন্তু পিতা? তিনি তো জন্মদাতা! তিনি কি করে মেনে নিলেন সন্তানের এমন করুণ মৃত্যু?
শিখা মৃত্যুর দ্বায়ভার কি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারবেন? যদি বাহির থেকেও রক্ত ক্রয় করে থাকে শিখার শশুড়ালয়, তবু কি ডাক্তারদের দায়ীত্ব ছিলনা রক্তের গ্রুপ, নম্বর ও মেয়াদ খুঁটিয়ে দেখে তা শরীরে পুশ করা? স্বাভাবিত তাপমাত্রায় রক্ত বহন করা হয়েছিল কিনা তা লক্ষ্য করা?

মৃত্যুকালে শিখার হাতে একটি কলম ধরিয়ে দিলে হয়তো সৃষ্টি হতো ইতিহাসের সেরা কবিতা। যেতে যেতে হয়তো সে লিখে যেত-
“বাপ কি স্বামী, সব নরাধম কুকুর জানি
স্বার্থলোভী তোরা, ঘৃণ্য চতূষ্পতি প্রাণি।”

শুধু এক শিখা নয়, প্রতিদিন এমন বহু শিখা আমাদের মুখে লাথি মেরে চলে যায়। আমরা বধীর অন্ধ স্বার্থলোভী জাতি, শুধু তাদের যেতে দেই।

Related Articles

Back to top button